ইন্দ্রজিৎ সাহু, লক্ষ্মণনাথ: এক দিকে ঘন সবুজের বুক চিরে বয়ে চলেছে সুবর্ণরেখা। অন্য দিকে মন্দির, পুরনো দালান আর সময়ের ছাপ বয়ে চলা রাজবাড়ি। বাংলা থেকে ওড়িশায় প্রবেশের মুখে লক্ষ্মণনাথ যেন শুধু একটি সীমান্ত-জনপদ নয়, ইতিহাসের দরজাও বটে। আর সেই ইতিহাসের অন্যতম বড় পরিচয় এখানকার শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজো। রাজপরিবারের সদস্যদের দাবি, পাঁচশো বছরেরও বেশি সময় ধরে লক্ষ্মণনাথের রাজগড়ে দুর্গার আরাধনা হয়ে আসছে।
সময় বদলেছে, জমিদারি হারিয়েছে, বহু পুরনো রীতিও আজ আর আগের মতো নেই। তবু পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস এখনও মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। এক সময় এই পুজোর বিশেষ আকর্ষণ ছিল বিশাল দুর্গাপ্রতিমা। নবমীতে মহিষ বলির প্রচলন থাকলেও কালের নিয়মে তা বর্তমানে বন্ধ, বিজয়া দশমীতে সুবর্ণরেখার জলে প্রতিমা নিরঞ্জনের রীতি বহু বছর ধরে চলে এসেছে বলে পরিবারের সদস্যদের দাবি। সেই টানেই এক সময় বাংলা ও ওড়িশার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমাতেন লক্ষ্মণনাথে।
রাজগড়ের প্রবেশপথ পেরোতেই চোখে পড়ে সাদা রঙের সুবিশাল পুরনো বাড়ি। নীল আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা সেই স্থাপত্য যেন অতীতের কোনও ফ্রেম। এক পাশে মহাদেবের মন্দির। ভিতরে ঢুকলে পুরনো দালান, চুন-সুরকির কাজ, কাঠের দরজা-জানালা এবং বিস্তৃত উঠোনে এখনও জমিদারি আমলের ছাপ স্পষ্ট। সরু খাড়া সিঁড়ি ধরে উপরে উঠলে চোখে পড়ে পুরনো কারুকাজ। কোথাও দেওয়ালে সময়ের ক্ষত, কোথাও আবার এখনও টিকে রয়েছে নকশা ও স্থাপত্যের পুরনো সৌন্দর্য। রাজবাড়ির পশ্চিম দিকে রয়েছে বিশাল দুর্গামণ্ডপ। সেখানেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দুর্গার আরাধনা হয়েছে।
রাজবাড়ির ভিতরেই রয়েছে পরিবারের কুলদেবী মা শ্যামাসুন্দরীর মন্দির। পরিবারের দাবি, দেবীমূর্তির পাথর এসেছিল অস্ট্রেলিয়া থেকে। পাশে রয়েছে বিষ্ণুমূর্তি। শিউলি গাছের ছায়া, মন্দিরের সারি আর পুরনো বাড়ির স্থাপত্য মিলিয়ে গোটা চত্বরের পরিবেশে রয়েছে আলাদা আবেশ। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, এক সময় অজয় ও দামোদর নদীর তীরবর্তী এলাকায় সুর বংশের রাজাদের প্রভাব ছিল। পরে হোসেন শাহের আমলে রামচন্দ্র ঘোষ জলেশ্বর এলাকার সদর কানুনগোর দায়িত্ব পান। পরিবারের সদস্যদের দাবি, ১৫০৮ সালের পর জলেশ্বরে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন তিনিই। পরবর্তীতে লক্ষ্মণনাথে জমিদারবাড়ি গড়ে উঠলে এখানে নতুন করে দেবীর আরাধনা শুরু হয়।
সুবর্ণরেখার তীর ঘেঁষা এই এলাকায় রয়েছে আরও বহু পুরনো স্থাপত্যের স্মৃতি। স্থানীয়দের দাবি, ১৭২০ সালে তৈরি ঐতিহাসিক মহাশয়গড়ও এই এলাকার ঐতিহ্যের অংশ। প্রায় দু’একর জমির উপর গড়ে ওঠা জমিদারবাড়ির প্রতিটি কোণ যেন ধরে রেখেছে কয়েক শতাব্দীর স্মৃতি। আজ আর সেই জমিদারি নেই। নেই অতীতের জাঁকজমকের অনেক কিছুই। তবু শরৎ এলেই রাজগড়ের চত্বরে যেন ফিরে আসে পুরনো দিনের আবহ। ঢাকের শব্দ, মন্দিরের ঘণ্টা আর সুবর্ণরেখার হাওয়া মিলেমিশে মনে করিয়ে দেয়। ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় নয়, কখনও কখনও সে বেঁচে থাকে একটি পুজো, একটি প্রাসাদ আর মানুষের স্মৃতির মধ্যেও। বাংলা-ওড়িশা সীমান্তের লক্ষ্মণনাথ তাই শুধু পথের ঠিকানা নয়। পাঁচশো বছরের দুর্গারাধনা, রাজবাড়ির স্থাপত্য আর সুবর্ণরেখার সৌন্দর্য সব মিলিয়ে এটি যেন সীমান্তের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত ঐতিহ্য।













