ইন্দ্রজিৎ সাহু, সবং: চিকিৎসা শুধুই একটি পেশা নয়, এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক মহান দায়িত্ব। রোগী সুস্থ হলে চিকিৎসককে ‘ভগবান’ বলা হয়, আর ব্যর্থ হলে তিনিই হয়ে ওঠেন সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তবুও সমস্ত প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে মানবসেবার শপথ নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে চলেন প্রকৃত চিকিৎসকেরা। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সবং ব্লকের দশগ্রামের প্রবীণ এমবিবিএস চিকিৎসক ডা. সুজয় রঞ্জন দাস সেই বিরল ব্যতিক্রমদেরই একজন। বর্তমানে তাঁর বয়স ৮৬ বছর। দীর্ঘ ৫৭ বছর ধরে নিজের গ্রামেই স্বল্প খরচে চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে চলেছেন তিনি। যেখানে গ্রামাঞ্চলে সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত দক্ষ চিকিৎসকের সংখ্যা হাতে গোনা, সেখানে দশগ্রাম ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের কাছে আজও ভরসার নাম ডা. সুজয় রঞ্জন দাস। প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী তাঁর কাছে চিকিৎসার জন্য আসেন। বহু অসহায় মানুষ, যাঁদের চিকিৎসা বা ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই, তাঁদেরও সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসা দিয়ে পাশে দাঁড়ান তিনি। শুধু চিকিৎসক হিসেবেই নয়, সংগ্রামী মানুষ হিসেবেও তাঁর জীবন অনুপ্রেরণার। ছোটবেলায় জন্মের পরই মাকে হারান। পরে যক্ষ্মা রোগে বাবা ও জ্যাঠার মৃত্যু হয়। নিঃসন্তান জ্যাঠিমা আলোচনা দাস তিন ভাইকে মানুষ করেন। শৈশবের সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতাই তাঁকে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখায়। ১৯৫৭ সালে দশগ্রাম সতীশচন্দ্র সর্বার্থসাধক শিক্ষাসদন হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করার পর চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তীতে কলকাতার বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে সুযোগ পেয়ে ১৯৬৫ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সুযোগ এলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর একটাই লক্ষ্য ছিল। নিজের গ্রামের মানুষের পাশে থাকা এবং চিকিৎসার অভাবে যেন আর কোনও পরিবারকে তাঁর পরিবারের মতো অসহায় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়। ডা: সুজয় রঞ্জন দাস জানান, চিকিৎসা তাঁর কাছে কখনও ব্যবসা নয়, মানুষের সেবা। তাই আজও সামান্য ফি নিয়ে রোগীদের চিকিৎসা করে চলেছেন। ভবিষ্যতেও যতদিন শারীরিকভাবে সক্ষম থাকবেন, ততদিন মানুষের পাশে থাকার ইচ্ছাই তাঁর। আড্ডার ফাঁকে উঠে আসে ১৯৭০ সালের এক রোমহর্ষক স্মৃতিও। নারায়ণগড় ব্লকের দুড়িয়া মৌজার তৎকালীন জমিদার রাজেন জানার চিকিৎসা করতে গিয়ে ডাকাতদের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় বন্দুক ঠেকিয়ে তাঁকে রাজেন জানা ভেবে সোনার খোঁজ জানতে চায় ডাকাতরা। পরে তিনি চিকিৎসক বলে পরিচয় দিলে তাঁকে ছেড়ে দেয়। এরপর জমিদারকে মারধর করে বাড়িতে লুটপাট চালায় দুষ্কৃতীরা। সেই বিভীষিকাময় ঘটনার স্মৃতি আজও স্পষ্ট তাঁর মনে। অর্থের মোহ নয়, মানুষের সুস্থ হাসিই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার যুগেও পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে মানবসেবার যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ডা. সুজয় রঞ্জন দাস গড়ে তুলেছেন, তা নিঃসন্দেহে আগামী প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
দশগ্রামে মানবসেবার উজ্জ্বল মুখ ডাঃ সুজয় রঞ্জন দাস
Published on: July 26, 2026

---Advertisement---










