ইন্দ্রজিৎ সাহু, খড়গপুর: জমিদারি নেই। আগের মতো জাঁকজমকও আর নেই। সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে যাত্রাপালা, কৃষ্ণযাত্রা, ঝুমুর গানের আসরও। তবু ১৭১ বছর পেরিয়েও বদলায়নি কিছু নিয়ম। উল্টোরথে রুপোর কয়েন দিয়ে মাটি তোলা থেকে জন্মাষ্টমীতে প্রতিমা তৈরির সূচনা, শতাব্দীপ্রাচীন ঢাকের বোল থেকে দশমীর ‘কুমড়োবধ’ পুরনো রীতিকে আঁকড়ে আজও দুর্গাপুজো হয় খড়গপুরের মালঞ্চের দত্তবাড়িতে।
এক সময় এলাকায় জমিদার পরিবার হিসাবেই পরিচিত ছিলেন দত্তরা। সেই সময় থেকেই বাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন। প্রথম দিকে পুজো হত শাক্তমতে। ছিল পাঠাবলির প্রথাও। তবে প্রায় ১০০ বছর আগে সেই বলি বন্ধ হয়ে যায়। তার পর থেকেই বৈষ্ণব মতে দেবীর আরাধনা শুরু হয় বলে পরিবারের দাবি।
বৈষ্ণব রীতির প্রভাব আজও স্পষ্ট। পঞ্চমী থেকেই দত্ত বাড়িতে আমিষ খাবার খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের পরেই ফের মাছ খাওয়ার নিয়ম। তবে বলি বন্ধ হয়ে গেলেও তার স্মৃতি মুছে যায়নি। যে খড়্গ দিয়ে এক সময় পাঠাবলি হত, শতাব্দীপ্রাচীন সেই অস্ত্র আজও সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে পরিবারের কাছে।
দত্ত বাড়ির পুজোয় প্রতিমা ঘিরেও রয়েছে বিশেষ প্রথা। পরিবারের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, পুজোর নির্দিষ্ট আচার সম্পন্ন হওয়ার আগে প্রতিমার মুখ সকলের সামনে দেখানো হয় না। প্রতিমা তৈরির সূচনাও হয় বিশেষ নিয়মে। উল্টোরথের দিন বাড়ির তুলসীমঞ্চ থেকে রুপোর কয়েন দিয়ে মাটি তুলে রাখা হয়। জন্মাষ্টমীর দিন সেই মাটি দিয়েই শুরু হয় প্রতিমা গড়ার কাজ। এক সময় এই দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বসত যাত্রাপালার আসর। প্রায় ২৬ বছর আগে তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অতীতে কৃষ্ণযাত্রা ও ঝুমুর গানের আয়োজনও ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই সব অনুষ্ঠান হারিয়ে গেলেও এখনও শিবের গান হয় দত্তবাড়ির পুজোয়।
বাদ্যযন্ত্রেও ধরা রয়েছে ইতিহাস। প্রাচীন নিয়ম মেনে এখনও তিনটি ঢাক ও একটি ঢোল বাজানো হয়। পরিবারের কাছে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন একটি ঢাক। সারা বছর সেটি যত্নে তুলে রাখা হয়। দুর্গাপুজো এলেই পুরনো ঢাকটি আবার বের করা হয়। নতুন ঢাকের সঙ্গে বাজে সেই বহু বছরের পুরনো বাদ্যযন্ত্রও। তবে এই পুজোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় আচার দশমীর ‘কুমড়োবধ’। বিসর্জনের আগে একটি চালকুমড়ো রেখে তির-ধনুক দিয়ে সেটিকে বিদ্ধ করা হয়। প্রথমে এক ব্রাহ্মণ এই অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। তার পর তির ছোড়েন বাড়ির গৃহকর্তা। সব শেষে অংশ নেন আদিবাসী তিরন্দাজেরা।
পরিবারের প্রথা অনুযায়ী, কুমড়ো নির্দিষ্ট নিয়মে তিন বার বিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয় না। কুমড়োবধ শেষ হলেই শুরু হয় দেবীকে বিদায় জানানোর পর্ব। ১২ জন বাহকের কাঁধে চেপে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় পরিবারের নিজস্ব পুকুরে। সেখানেই হয় নিরঞ্জন। ১৭১ বছরে বদলেছে সমাজ, বদলেছে জমিদারবাড়ির চেহারা। বন্ধ হয়েছে বলি, থেমেছে যাত্রার আসর। কিন্তু শতাব্দী পেরিয়েও হারায়নি পারিবারিক রীতির বাঁধন। পুরনো খড়্গ, প্রাচীন ঢাক আর দশমীর কুমড়োবধ আজও যেন মালঞ্চের দত্তবাড়ির অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে জুড়ে রেখেছে।













