ইন্দ্রজিৎ সাহু, নারায়ণগড়: পুকুরের নাম ‘মড়াপুকুর’। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে কোনও পুরনো কাহিনি। সেই পুকুরের মাটি খুঁড়েই নাকি এক দিন উঠে এসেছিল পাথরের দেবীমূর্তি। তার পর স্বপ্নাদেশ। শুরু দেবীর আরাধনা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়েও সেই বিশ্বাস আজও অটুট পশ্চিম মেদিনীপুরের নারায়ণগড় ব্লকের কুনারপুর অঞ্চলের সোগুড়িয়া গ্রামে।
গ্রামের প্রবীণদের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায় সেই কাহিনি। জনশ্রুতি, বহু বছর আগে বাংলায় বর্গীদের আনাগোনার সময় সোগুড়িয়া গ্রামে একটি পুকুর খনন করা হয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি, সেই খননকাজে বর্গীদেরও যোগ ছিল। পরে ওই পুকুরই মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে ‘মড়াপুকুর’ নামে।আর সেই মড়াপুকুর ঘিরেই গ্রামের ইতিহাসে জুড়ে যায় এক রহস্যময় অধ্যায়।
কথিত আছে, পুকুর খননের সময় মাটির গভীর থেকে পাওয়া যায় একটি প্রাচীন পাথরের দেবীমূর্তি। দীর্ঘ সময় মাটির নীচে থাকার পরেও মূর্তিটি অক্ষত ছিল বলে দাবি গ্রামবাসীদের। খবর ছড়াতেই তখন এলাকায় তৈরি হয়েছিল বিস্ময় ও ভক্তির আবহ।
এর পরেই নাকি গ্রামের কয়েক জন স্বপ্নাদেশ পান। সেই স্বপ্নাদেশকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় চণ্ডীমাতার আরাধনা। ধীরে ধীরে একটি পরিবারের পুজো আর শুধু পরিবারের মধ্যে আটকে থাকেনি। তা হয়ে ওঠে গোটা গ্রামের উৎসব। কালের নিয়মে বদলেছে সোগুড়িয়া। বদলেছে বাড়িঘর, রাস্তা, মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু বদলায়নি দেবীর প্রতি বিশ্বাস। আজও বৈশাখ এলেই নতুন করে জেগে ওঠে সেই পুরনো স্মৃতি।
টানা প্রায় ছ’দিন ধরে গ্রামে পূজিত হন চণ্ডী, শীতলা ও মনসা মা। পুজোর সঙ্গে চলে নানা ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান। আলোকসজ্জা, ভক্তসমাগম, সাংস্কৃতিক আয়োজন সব মিলিয়ে কয়েক দিনের জন্য অন্য চেহারা নেয় সোগুড়িয়া। কর্মসূত্রে যাঁরা গ্রামের বাইরে থাকেন, তাঁদের অনেকেই এই সময় বাড়ি ফেরেন। আত্মীয়স্বজনের আসা-যাওয়া, দেবীদর্শন, পুজোর আচার আর মিলনমেলায় মেতে ওঠে গোটা গ্রাম। ফলে এই পুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, গ্রামের মানুষের কাছে এটি শিকড়ে ফেরারও উপলক্ষ।
প্রবীণদের কাছে মড়াপুকুর মানেই পূর্বপুরুষদের মুখে শোনা গল্প। নতুন প্রজন্মের কাছে সেটাই গ্রামের ঐতিহ্যের পরিচয়। বর্গীদের সঙ্গে এই পুকুর খননের যোগ কতটা ঐতিহাসিক ভাবে নথিবদ্ধ, তার স্পষ্ট প্রমাণ এখনও সামনে নেই। মূর্তি উদ্ধারের কাহিনিও মূলত স্থানীয় জনশ্রুতির উপর নির্ভরশীল। তবু গ্রামের মানুষের বিশ্বাসে কোনও সংশয় নেই। তাঁদের কাছে মড়াপুকুর, পাথরের দেবীমূর্তি এবং চণ্ডীপুজো সবই একই ইতিহাসের অংশ।
বর্গীদের সঙ্গে সত্যিই কি জড়িয়ে রয়েছে সোগুড়িয়ার মড়াপুকুরের অতীত? নথি হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে। কিন্তু গ্রামের মানুষের স্মৃতি ও বিশ্বাসে সেই ইতিহাস আজও জীবন্ত, বৈশাখ এলেই চণ্ডী, শীতলা ও মনসা মায়ের আরাধনায় আবার জেগে ওঠে সোগুড়িয়া।













