ইন্দ্রজিৎ সাহু, সবং: সময় পেরিয়েছে, বদলেছে প্রজন্ম। কিন্তু বদলায়নি রীতি, বদলায়নি দেবী আরাধনার নিয়ম। কয়েক শতাব্দী ধরে একই পরম্পরা মেনে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং ব্লকের দশগ্রাম অঞ্চলের কোলন্দা গ্রামের ভূঁইয়া বাড়িতে। পুরনো ঐতিহ্য, পারিবারিক বিশ্বাস আর সাবেকিয়ানার মেলবন্ধনই এই পুজোর প্রধান বৈশিষ্ট্য।
এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানস রঞ্জন ভূঁইয়ার পরিবারের নামও। পরিবারের সদস্যদের দাবি, এটি তাঁদের ত্রয়োদশ প্রজন্মের দুর্গাপুজো। ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই রীতি মেনে চলে আসছে ভূঁইয়া বাড়ির এই পুজো। উৎসবের ক’টা দিন শুধু পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই নয়, আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে গোটা গ্রামজুড়ে।
ভূঁইয়া বাড়ির পুজোর সূচনাকে ঘিরেও রয়েছে নানা লোককথা। কথিত আছে, কন্দর্পনারায়ণ ভূপাল দাস ভূঁইয়া বর্গীদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে কেলেঘাই নদীর পাড়ে এসে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই শুরু হয় দেবী দুর্গার আরাধনা। তারপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে সেই পুজো আজও বহন করে চলেছে পরিবারের উত্তরসূরিরা।
এক সময় টেরাকোটার মন্দিরে দুর্গাপুজো হত। সময়ের সঙ্গে সেই মন্দির এখন অনেকটাই ভগ্নপ্রায়। তবে মন্দিরের চেহারা বদলালেও পুজোর নিয়মে ছেদ পড়েনি। পুরনো রীতি মেনেই আজও চলে দেবীর আরাধনা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এই পুজোকে ঘিরে রয়েছে গভীর বিশ্বাস। তাঁদের কথায়, দেবীর কাছে নিষ্ঠার সঙ্গে মানত করলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়। সেই বিশ্বাসেই পুজোর দিনগুলিতে ভূঁইয়া বাড়ির গড়ে ভিড় জমান আশপাশের বহু মানুষ।
এই বাড়ির পুজোর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল কুলদেবতার উপস্থিতি। দুর্গামণ্ডপের পাশেই রয়েছেন পরিবারের কুলদেবতা শ্যামসুন্দর জীউ ও শ্রী রাধিকা। পরিবারে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, বহু বছর আগে বাড়ির এক সদস্য স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন কুলদেবতা পরিবারের কাছেই থাকতে চান। তার পর থেকেই তাঁদের দুর্গামন্দিরের পাশে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই সময় থেকে দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি প্রতিদিন কুলদেবতারও নিয়মিত পুজো চলে আসছে।
ভোগের ক্ষেত্রেও রয়েছে নিজস্ব রীতি। বাইরের দোকান থেকে কেনা কোনও মিষ্টি দেবীর কাছে নিবেদন করা হয় না। বাড়িতেই তৈরি করা হয় মিষ্টান্ন এবং সেই ভোগই দেওয়া হয় দেবীকে। বছরের পর বছর ধরে একই নিয়ম মেনে চলছেন পরিবারের সদস্যরা।
নবমীর অন্যতম আকর্ষণ কুমারী পুজো। ওই দিন সকাল থেকেই বাড়িতে বাড়তি ব্যস্ততা চোখে পড়ে। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি গ্রামের বহু মানুষও অংশ নেন পুজোর আনন্দে।
চারশো বছরেরও বেশি সময় পার হলেও তাই কোলন্দার ভূঁইয়া বাড়ির দুর্গাপুজো আজও শুধু একটি পারিবারিক উৎসব নয়। ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, পারিবারিক স্মৃতি আর গ্রামীণ বাংলার সাবেক পুজো-সংস্কৃতিকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে এই প্রাচীন আরাধনা।













