প্রথম পাতারাজনীতিপশ্চিমবঙ্গকলকাতাদেশআন্তর্জাতিকবিনোদনখেলালাইফস্টাইলআবহাওয়াভাইরালচাকরিবাজারদরবিজ্ঞান প্রযুক্তিস্বাস্থ্যঐতিহাসিক
---Advertisement---

জঙ্গলে হাতির আতঙ্ক, বাজারে সোনার দামে দুর্গা ছাতু

Published on: September 1, 2026
---Advertisement---

মেদিনীপুর, ১ সেপ্টেম্বর: একদিকে জঙ্গলজুড়ে হাতির আনাগোনা, অন্যদিকে বর্ষার শেষে মাথা তুলেছে জঙ্গলমহলের বহু প্রতীক্ষিত দুর্গা ছাতু বা কাড়াঙ ছাতু। কিন্তু এবার এই দুইয়ের টানাপোড়েনে বদলে গিয়েছে ছাতুর বাজার। হাতির ভয়ে গভীর জঙ্গলে ঢুকতে চাইছেন না অনেকেই। ফলে কমেছে ছাতু সংগ্রহ, কমেছে বাজারে জোগান। আর সেই সুযোগেই চড়চড় করে বেড়েছে দাম। পরিস্থিতি এমনই যে, কলি অবস্থার দুর্গা ছাতুর দাম কোথাও কোথাও খাসির মাংসের দামকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। মেদিনীপুর শহরের বিভিন্ন বাজারে এখন দুর্গা ছাতুর পসরা। দাম শুনে চোখ কপালে উঠলেও মরশুমি এই খাবারের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে চাইছেন না ক্রেতারা। দরদাম করে অল্প পরিমাণ হলেও ছাতু কিনছেন অনেকে।

গৃহসজ্জায় নতুন চমক, চাঁদকুড়ি বাজারে ‘লাক্সারী অ্যাকোমোডেশন’

বর্তমানে খাসির মাংস কেজি প্রতি প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিকোচ্ছে। সেখানে পুরোপুরি না-ফোটা কলি দুর্গা ছাতুর দাম ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা কেজি পর্যন্ত উঠেছে। আর ছাতু ফুটে গেলে দাম কিছুটা কমে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে থাকছে।

দুর্গা ছাতু সংগ্রহের জন্য অনেক সময় জঙ্গলের বেশ গভীরে যেতে হয়। কিন্তু পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলে এই মুহূর্তে একাধিক হাতির দল ঘুরে বেড়ানোয় সেই কাজ রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হাতির পাশাপাশি সাপ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে আগের মতো নির্বিঘ্নে জঙ্গলে ঢুকতে পারছেন না ছাতু সংগ্রহকারীরা।

মেদিনীপুর শহরের কলেজ স্কোয়ারে ছাতু বিক্রি করছেন রবি রানা। তাঁর কথায়, হাতির উপস্থিতির কারণে এবার ছাতুর জোগান কমেছে। তাঁর বক্তব্য, “দাম বাড়লেও মানুষ কিনছে। খাসির মাংস রোজ পাওয়া যাবে, ছাতু তো আর রোজ পাওয়া যাবে না।” বিক্রেতা সবিতা মাহাতো জানান, এই মরশুমে তিনি সাধারণত প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ কেজি ছাতু বিক্রি করেন। কিন্তু এবার গভীর জঙ্গলে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সংগ্রহ কমেছে। ফলে পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে ছাতু কিনতে হচ্ছে। আরেক বিক্রেতা মালতি মাহাতোর দাবি, কলি ছাতুর দাম প্রায় দেড় হাজার টাকা কেজি ছুঁয়েছে। দীপক মাহাতো জানান, এখন যে অংশে হাতির অবস্থান নেই, মূলত সেদিকের জঙ্গল থেকেই ছাতু সংগ্রহের চেষ্টা করছেন তাঁরা।

হাতির আনাগোনা এখন পশ্চিম মেদিনীপুরের মেদিনীপুর সদর, গড়বেতা, শালবনী, গোয়ালতোড়-সহ জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ এলাকায়। চাঁদড়া রেঞ্জের বন আধিকারিক লক্ষ্মীকান্ত মাহাতোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু চাঁদড়া রেঞ্জ এলাকাতেই রয়েছে প্রায় ১১৬টি হাতি। তাদের মধ্যে রয়েছে ১৮ থেকে ২০টি শাবক। গাডড়ার জঙ্গলে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০টি, আমাঝরনায় ৩০ থেকে ৩৫টি, চাউলকুড়ায় প্রায় ৩০টি এবং শুকনাখালির জঙ্গলে ১৫ থেকে ২০টি হাতি রয়েছে বলে বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে।খাবারের সন্ধানে হাতির দল জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ের দিকে চলে আসায় বাড়ছে মানুষ-হাতি সংঘাতের আশঙ্কা।এদিকে সদ্য ধান রোপণের কাজ শেষ করেছেন বহু কৃষক। সেই ধানের জমিতেই ঢুকে পড়ছে হাতির দল। কোথাও ধান খেয়ে ফেলছে, কোথাও আবার জমির উপর দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে পায়ের তলায় মাড়িয়ে নষ্ট করছে ফসল। বন দফতর সূত্রে খবর, চাঁদড়া রেঞ্জ এলাকাতেই গত কয়েক দিনে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ বিঘা ধানজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন কৃষক।

ভাদ্র-আশ্বিনে বর্ষার শেষভাগ থেকে শরতের শুরু এই সময়েই জঙ্গলমহলের শালবন, স্যাঁতসেঁতে মাটি, ঝোপঝাড় ও ফাঁকা জমিতে দেখা মেলে দুর্গা ছাতুর। জঙ্গলমহলের মানুষের কাছে এটি শুধু রসনার খাবার নয়, বহু পরিবারের মরশুমি বাড়তি আয়ের অন্যতম অবলম্বন।

কিন্তু হাতির উপস্থিতি এবার সেই উপার্জনের পথও কঠিন করে তুলেছে। বন দফতরের সতর্কতা সত্ত্বেও রুজির টানে কেউ কেউ জঙ্গলে ঢুকছেন। আর সেখানেই তৈরি হচ্ছে বিপদের আশঙ্কা। চাঁদড়া রেঞ্জের বন আধিকারিক লক্ষ্মীকান্ত মাহাতো জানিয়েছেন, হাতির অবস্থান রয়েছে এমন জঙ্গলের গভীরে না যাওয়ার জন্য গ্রামবাসীদের নিয়মিত সতর্ক করা হচ্ছে। ছাতু, পাতা বা শুকনো কাঠ সংগ্রহের পাশাপাশি গবাদি পশু নিয়েও জঙ্গলে ঢুকতে নিষেধ করা হয়েছে। জঙ্গলমহলে এখন তাই এক অদ্ভুত ছবি। যে জঙ্গল থেকে বছরের এই সময়ে ছাতু তুলে সংসারে বাড়তি আয় হয়, সেই জঙ্গলেই এখন ওত পেতে রয়েছে হাতির আতঙ্ক। মানুষ জঙ্গলে কম ঢুকছেন, ফলে ছাতুর জোগানও কমছে। অথচ ক্রেতাদের চাহিদায় ভাটা নেই। ফলে চাহিদা ও জোগানের ফারাকেই এবার দুর্গা ছাতুর বাজারে আগুন। কলি ছাতুর কেজি দেড় হাজার টাকা জঙ্গলমহলের বাজারে মরশুমি এই ছাতুই এখন রীতিমতো ‘দামি’ খাবার।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now