নিজস্ব সংবাদদাতা: মহাকাশে প্রায় দেড় বছর ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর পর অবশেষে চাঁদের বুকে সজোরে আছড়ে পড়ল ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্স-এর একটি বিশাল রকেটের অংশ। প্রায় ৪ হাজার কেজি ওজন এবং পাঁচতলা বাড়ির সমান আকারের এই ধাতব কাঠামোটি ঘণ্টায় ৮,৬৯০ কিলোমিটার গতিবেগে চাঁদের মাটিতে আঘাত হানে। বিস্ফোরণের অভিঘাতে চাঁদের ধুলো কয়েক মিনিটের জন্য প্রায় ১০০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত ছিটকে ওঠে বলে জানিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
তবে এই ঘটনায় পৃথিবীবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। নাসা স্পষ্ট জানিয়েছে, সংঘর্ষটি সম্পূর্ণভাবে চাঁদের পৃষ্ঠে ঘটেছে এবং পৃথিবীর জন্য এর কোনো ঝুঁকি নেই। ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি। সেদিন ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ফ্যালকন-৯ রকেটে চড়ে চাঁদের উদ্দেশে রওনা দেয় ‘ব্লু ঘোস্ট’ এবং ‘হাকুতো-আর’ ল্যান্ডার। মিশন সফল হলেও রকেটের উপরের অংশটি আর পৃথিবীতে ফেরেনি। এরপর প্রায় ১৮ মাস ধরে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষের টানে তার কক্ষপথ বদলাতে বদলাতে শেষ পর্যন্ত চাঁদের সঙ্গে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
সংঘর্ষটি হয়েছে চাঁদের আইনস্টাইন ক্রেটার সংলগ্ন এলাকায়। যদিও ঘটনাটি খালি চোখে বা সাধারণ টেলিস্কোপে দেখা যায়নি, কারণ তখন ওই অংশে পর্যাপ্ত আলো ছিল না।
এখন নজর দক্ষিণ কোরিয়ার দানুরি অরবিটার এবং নাসার লুনার রিকনিসেন্স অরবিটার (LRO)-এর দিকে। আগামী দিনে তারা সংঘর্ষস্থলের ছবি তুলবে। সেই ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নতুন গর্তের আকার, গভীরতা এবং ধূলিকণার বিস্তার নিয়ে গবেষণা করবেন। এই ঘটনার মাধ্যমে চাঁদে মানুষের ফেলে যাওয়া বস্তু বা ধ্বংসাবশেষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল প্রায় ৩,০০০। মোট ওজন প্রায় ১৯০ টন। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে চন্দ্রাভিযান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধ্বংসাবশেষই নতুন বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। একইসঙ্গে ঐতিহাসিক অ্যাপোলো ল্যান্ডিং সাইটগুলিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তবে উদ্বেগের মাঝেও আশার আলো দেখছেন গবেষকরা। তাঁদের মতে, এই পরিকল্পনাবহির্ভূত সংঘর্ষ চাঁদের মাটির গঠন, ধূলিকণার আচরণ এবং সৌরজগতের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে নতুন তথ্য জানার বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে। উল্লেখ্য, যে ফ্যালকন-৯ রকেটের উপরের অংশটি চাঁদে ভেঙে পড়েছে, তার পুনর্ব্যবহারযোগ্য বুস্টারটি নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছিল। স্পেসএক্স সেই একই বুস্টারকে ১৮তম বারের জন্য আবার মহাকাশে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। একদিকে পুনর্ব্যবহারের সাফল্য, অন্যদিকে পথভ্রষ্ট অংশের চাঁদে পতন মহাকাশ প্রযুক্তির দুই ভিন্ন ছবিই যেন একসঙ্গে তুলে ধরল এই ঘটনা।












