অরিজিৎ দাস অধিকারী, শিক্ষক: আকাশে মেঘ, মাটিতে বৃষ্টির ছোঁয়া। শাল-মহুয়ার জঙ্গলে তখন এক অন্যরকম ব্যস্ততা। ভোরের আলো ফোটার আগেই হাতে ঝুড়ি, ব্যাগ কিংবা কোদাল নিয়ে জঙ্গলের পথে পা বাড়াচ্ছেন আট থেকে আশি। লক্ষ্য একটাই প্রকৃতির বুক চিরে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা সেই কাঙ্ক্ষিত বুনো ছাতু।
শহুরে বাজারে মাশরুমের নানা প্রজাতি চাষ করে পাওয়া গেলেও জঙ্গলমহলের মানুষের কাছে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ছাতুর আকর্ষণই আলাদা। তীব্র গরমের পর বৃষ্টির জল মাটিকে ভিজিয়ে দিলে, ঝরাপাতা ও জৈব উপাদানে তৈরি হয় আর্দ্র পরিবেশ। আর সেই অনুকূল পরিবেশেই কোথাও হঠাৎ মাথা তোলে প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ। কুড়কুড়ে, পুটকা, কাড়ান, দুর্গা, উঁই নাম আলাদা, স্বাদে নিজস্বতা। জঙ্গলমহলের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় পরিবেশ ও জন্মস্থানের ভিত্তিতে বুনো ছাতুর রয়েছে নানা পরিচয়। বিশেষ করে কুড়কুড়ে বা পুটকা ছাতু বর্ষাকালে জঙ্গলবাসীর কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং বহু পরিবারের বাড়তি আয়ের উৎস। বর্ষার ভেজা সকালে তাই জঙ্গলের পথে শুরু হয় ছাতু খোঁজার অভিযান। কোথাও গাছের গোড়ায়, কোথাও ঝরাপাতার আড়ালে, আবার কোথাও মাটির সঙ্গে মিশে থাকা ছাতুকে অভিজ্ঞ চোখ সহজেই চিনে নেয়। সাধারণ চোখে যা নিছক মাটি কিংবা শুকনো পাতার স্তূপ, অভিজ্ঞ ছাতু-সংগ্রাহকের কাছে সেখানেই লুকিয়ে থাকে দিনের রোজগার।
শুধু খাবার নয়, ছাতুকে ঘিরে জঙ্গলমহলের রয়েছে দীর্ঘদিনের লোকজ ঐতিহ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাবা-মা, দাদু-ঠাকুমার হাত ধরে অনেকেই শিখেছেন জঙ্গলের কোন ছাতু সংগ্রহ করতে হয়, কোনটি এড়িয়ে চলতে হয়। এই জ্ঞান বইয়ের পাতায় নয়, মানুষের মুখে মুখে এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই বেঁচে রয়েছে।
আর কাঙ্ক্ষিত ছাতু হাতে এলে? মুখে চওড়া হাসি। কারণ সেই ছাতু একদিকে পরিবারের রান্নাঘরে পৌঁছয়, অন্যদিকে চলে যায় হাটে-বাজারে। ভাজা, চচ্চড়ি, ঝাল, ঝোল কিংবা টক বাঙালির রান্নাঘরে ছাতুর পদও কম বৈচিত্র্যময় নয়। জঙ্গলমহলের বহু পরিবার বর্ষার এই কয়েক দিনের প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বাড়তি আয়ের মুখ দেখেন।কখনও ভোরে জঙ্গল, দুপুরে হাট এই ছন্দেই চলে জীবনের চাকা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও দেখা যাচ্ছে, বর্ষার মরশুমে বুনো ছাতু সংগ্রহ ও বিক্রির সঙ্গে জঙ্গলমহলের বহু মানুষের জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে।
বর্ষার শেষে আবার আসে অন্য আকর্ষণ কাড়ান বা দুর্গাছাতু। দুর্গাপুজোর আগের সময়ে এই ছাতুকে ঘিরে জঙ্গলমহলের হাটে-বাজারে তৈরি হয় আলাদা উন্মাদনা। স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতিতে এর গুরুত্ব এতটাই বেশি যে বাজারে এলেই শুরু হয় চাহিদা। তবে প্রকৃতির এই সম্পদ সংগ্রহের সঙ্গে রয়েছে ঝুঁকিও। বৃষ্টিভেজা জঙ্গল, সাপের আতঙ্ক, কাঁটাঝোপ, দুর্গম পথ কখনও বুনো হাতির ভয়ও উপেক্ষা করতে হয় সংগ্রাহকদের। তবু কয়েকটি ছাতুর আশায় ভোররাতেই জঙ্গলে ঢুকে পড়েন তাঁরা। কারণ এই ছাতু তাঁদের কাছে শুধু স্বাদের নয়, সংসারের বাড়তি আয়েরও আশ্রয়।
তবে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব বুনো ছাতু খাওয়ার উপযোগী নয়। রং, আকৃতি বা রূপার চামচের মতো লোকমুখে প্রচলিত পরীক্ষার মাধ্যমে বিষাক্ত ছাতু নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায় না। অপরিচিত বা সন্দেহজনক বুনো ছাতু খাওয়া তাই বিপজ্জনক হতে পারে। অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া কোনও বুনো ছাতু সংগ্রহ বা খাওয়া উচিত নয়।
প্রকৃতির সঙ্গে জঙ্গলমহলের মানুষের এই সম্পর্ক আসলে বহু পুরনো। শাল-মহুয়ার জঙ্গল তাঁদের শুধু ছায়া দেয়নি, দিয়েছে খাদ্য, জীবিকা ও সংস্কৃতির উপকরণও। তাই ছাতু আজ শুধুই একটি খাবার নয় এটি জঙ্গলমহলের লোকজ জীবন, ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও অর্থনীতির এক জীবন্ত গল্প।
বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে যখন জঙ্গল ভিজে ওঠে, তখন সেই সবুজের বুকেই শুরু হয় নীরব খোঁজ। ঝুড়ি হাতে মানুষ বেরিয়ে পড়েন প্রকৃতির দেওয়া উপহার সংগ্রহ করতে। কাঙ্ক্ষিত ছাতু মিললে মুখে হাসি, আর সেই হাসির সঙ্গে সচল হয় কোনও এক পরিবারের সংসারের চাকা। প্রকৃতির এই স্বাদ বেঁচে থাকুক, জঙ্গলমহলের ঐতিহ্যও বেঁচে থাকুক। আর যারা ঝুঁকি নিয়ে জঙ্গলে গিয়ে এই বনজ সম্পদ সংগ্রহ করেন, তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্যও পৌঁছক তাঁদের হাতে এই হোক মানবিকতার বার্তা।














