অরিজিৎ দাস অধিকারী, শিক্ষক ও সমাজসেবী: সময়ের স্রোত বয়ে যায়, প্রজন্ম বদলে যায়। বদলে যায় বিনোদনের ভাষা, প্রযুক্তি ও দর্শকের রুচি। কিন্তু কিছু নাম সময়ের সঙ্গে পুরনো হয় না। বরং যত সময় যায়, ততই গভীর হয় তাঁদের প্রভাব। বাঙালির কাছে তেমনই এক চিরকালীন নাম উত্তমকুমার। জন্মশতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর জনপ্রিয়তার আবেদন আজও অমলিন।
১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার ভবানীপুরে জন্ম অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের। পরবর্তীকালে বাংলা চলচ্চিত্রের রুপোলি পর্দায় তিনিই হয়ে ওঠেন উত্তমকুমার। দীর্ঘ সংগ্রাম, একের পর এক ব্যর্থতা এবং কঠোর পরিশ্রম পেরিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই তাঁর প্রয়াণ ঘটে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি তাঁর নাম। বরং নতুন প্রজন্মের কাছেও তাঁর অভিনয়, সিনেমা ও গান এখনও সমান জনপ্রিয়।
উত্তমকুমারের চলচ্চিত্রজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ১৯৫৩ সালে সাড়ে চুয়াত্তর ছবির মাধ্যমে। এই ছবিতেই সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। পরবর্তীকালে হারানো সুর, সপ্তপদী, সাগরিকা, দীপ জ্বেলে যাই সহ একাধিক ছবিতে তাঁদের জুটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নেয়।
তবে উত্তমকুমারের পরিচয় শুধুমাত্র রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে ভেঙে তৈরি করেছেন নানা চরিত্রে। নায়ক, চিড়িয়াখানা, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, অমানুষ, সন্ন্যাসী রাজা, যতুগৃহ সহ বিভিন্ন ছবিতে তাঁর অভিনয়ের বহুমাত্রিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের নায়ক ছবিতে অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তারকা-জীবনের আড়ালে থাকা মানুষের দ্বন্দ্ব, আত্মজিজ্ঞাসা ও মানসিক টানাপোড়েনকে তিনি যে গভীরতায় পর্দায় তুলে ধরেছিলেন, তা আজও দর্শক ও চলচ্চিত্র গবেষকদের কাছে আলোচনার বিষয়।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মঞ্চেও অভিনয় করেছেন উত্তমকুমার। ১৯৫৩ সালে স্টার থিয়েটারে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে শ্যামলী নাটকে অভিনয় করেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা, পরিচালনা এবং সংগীতের ক্ষেত্রেও তাঁর আগ্রহ ও কাজ বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় বহন করে।
উত্তমকুমারের অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল চরিত্রকে স্বাভাবিক করে তোলা। সংলাপের পাশাপাশি চোখের ভাষা, শরীরী অভিব্যক্তি এবং নীরবতার মাধ্যমেও তিনি দর্শকের কাছে চরিত্রের অনুভূতি পৌঁছে দিতে পারতেন। সেই অভিনয়শৈলীই তাঁকে তাঁর সময়ের জনপ্রিয় নায়ক থেকে পরবর্তীকালে বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম বড় আইকনে পরিণত করে। তাঁর অভিনীত ছবির গানও আজ বাঙালির নস্টালজিয়ার অংশ। প্রিয় মানুষকে নিয়ে পথ চলার সঙ্গে আজও জুড়ে যায় ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’। আবার স্মৃতির গভীরে ফিরে গেলে শোনা যায় ‘তুমি রবে নীরবে’।
জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমারকে ঘিরে ফের নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। তাঁর জীবন, চলচ্চিত্র এবং অভিনয়শৈলী নিয়ে নতুন প্রজন্মের আগ্রহও বাড়ছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও মন কি বাত-এ উত্তমকুমারের অবদান স্মরণ করেছেন। একজন অভিনেতার প্রকৃত সাফল্য হয়তো তাঁর পুরস্কার বা খ্যাতিতে নয়, বরং তাঁর চলে যাওয়ার পরেও কতটা গভীরভাবে তিনি মানুষের মনে থেকে যান, তার মধ্যে। সেই বিচারে উত্তমকুমার আজও অনন্য। ১৯৮০-তে কায়া হারিয়েছে, কিন্তু বাঙালির মননে তাঁর উপস্থিতি আজও অটুট। রুপোলি পর্দার সেই মহানায়ক তাই সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও বাঙালির আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে। উত্তমকুমার একটি নাম নয়, বাঙালির চলচ্চিত্র-স্মৃতির এক অবিনশ্বর অধ্যায়।













