নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: দুর্গাপুজোর আগেই রাজ্যের চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বড় সুখবর! একদিকে রাজ্য পুলিশে ১১ হাজারেরও বেশি কনস্টেবল নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দশ হাজারের বেশি প্রার্থীর হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, নতুন করে আরও ৯ হাজার পুলিশকর্মী নিয়োগের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে নিয়োগপত্র প্রদান অনুষ্ঠান থেকেই কর্মসংস্থান নিয়ে একের পর এক বড় ঘোষণা করেন তিনি। পুজোর মুখে যা নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীকে।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহেই রাজ্য পুলিশে আরও ৯ হাজার কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড। রাজ্যের থানাগুলিতে কর্মীসংকট কাটানো এবং পুলিশি পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করাই সরকারের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তিনি। শুধু কনস্টেবল নয়, থানার প্রশাসনিক কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে আরও ৬৫০ জন ক্লার্ক নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন শুভেন্দু।
নতুন নিয়োগের পাশাপাশি আটকে থাকা পুরনো নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী, কলকাতা পুলিশের প্রায় ৪ হাজার কনস্টেবল পদের পরীক্ষার ফল ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রকাশ করা হবে। ইতিমধ্যেই কলকাতা পুলিশের ৩০০ জন সাব-ইনস্পেক্টর নির্বাচিত হয়েছেন বলেও জানান তিনি। আরও প্রায় ১,১০০ এসআই পদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে আগামী জানুয়ারি মাসে কলকাতা পুলিশের নিয়োগ সংক্রান্ত আরও একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতে পারে।
নিয়োগপত্র প্রদান অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই পূর্বতন সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, ওবিসি সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন আটকে ছিল একাধিক নিয়োগ প্রক্রিয়া। সেই জট কাটাতে বর্তমান সরকারকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ করতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। শুভেন্দুর বক্তব্য, সরকার পরিবর্তন না হলে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া এগোনো সম্ভব হত না। হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টে সংরক্ষণ সংক্রান্ত মামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। যদিও নিয়োগ আটকে থাকার কারণ নিয়ে তাঁর এই বক্তব্য রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই উঠে এসেছে।
চাকরিপ্রার্থীদের আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনও ধরনের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। লিখিত পরীক্ষা, শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা, সংরক্ষণের রোস্টার এবং অন্যান্য মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে পরিচালনা করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তাঁর দাবি, নিয়োগে এমন কোনও ত্রুটি রাখা হবে না, যার কারণে পরবর্তী সময়ে আদালতে মামলা তৈরি হতে পারে কিংবা যোগ্য চাকরিপ্রার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এদিন সিভিক ভলান্টিয়ারদের ভূমিকা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, সিভিক ভলান্টিয়ারদের প্রতি তাঁর কোনও ব্যক্তিগত ক্ষোভ নেই। পুজোর আগে তাঁদের ভাতা দু’হাজার টাকা বাড়ানোর কথাও তুলে ধরেন তিনি। তবে পুলিশি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রশিক্ষণ, শারীরিক সক্ষমতা এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দেন শুভেন্দু। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষিত পুলিশকর্মী থাকা অত্যন্ত জরুরি।
দু’বছরের মধ্যে উত্তরপ্রদেশকে ছাপিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য! রাজ্যের পুলিশবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, আগামী দু’বছরের মধ্যে পুলিশকর্মীর সংখ্যায় উত্তরপ্রদেশকেও ছাপিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। পাশাপাশি পুলিশকর্মীদের বকেয়া আর্থিক প্রাপ্য ও মহার্ঘ ভাতা নিয়েও সরকারের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন তিনি। অক্টোবর মাসের বেতন ১৫ অক্টোবরের মধ্যে দেওয়ার আশ্বাসও দেন মুখ্যমন্ত্রী।
সব মিলিয়ে দুর্গাপুজোর মুখে রাজ্য পুলিশের নিয়োগপত্র প্রদান অনুষ্ঠান ঘিরে কর্মসংস্থানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা সামনে এল। একদিকে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা শেষে চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ, অন্যদিকে নতুন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তির প্রতিশ্রুতি দুই মিলিয়ে আশাবাদী চাকরিপ্রার্থীরা।
তবে ঘোষণার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, পরীক্ষার ফল ঘোষণা এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই এখন সরকারের বড় পরীক্ষা। এখন দেখার, নভেম্বরের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং ডিসেম্বরের ফলপ্রকাশের প্রতিশ্রুতি কতটা সময়মতো বাস্তবায়িত হয়। কারণ হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীর কাছে এই ঘোষণা শুধুই সরকারি প্রতিশ্রুতি নয়, নতুন জীবনের স্বপ্নপূরণের অপেক্ষা।












