নিজস্ব সংবাদদাতা: স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ একটি অবিস্মরণীয় দিন। দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। স্বাধীনতার আনন্দের পাশাপাশি দেশভাগের যন্ত্রণা, উদ্বাস্তু সমস্যা, দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক সংকট একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যেই শুরু হয়েছিল তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের পথচলা।
১৮৮৯ সালের ১৪ নভেম্বর এলাহাবাদে জন্মগ্রহণ করেন জওহরলাল নেহরু। পিতা মতিলাল নেহরু ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা। ইংল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা শেষ করে ভারতে ফিরে আইন পেশায় যুক্ত হলেও দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন নেহরু।
মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন ও আইন অমান্য আন্দোলন-সহ একাধিক ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন তিনি। স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনের কারণে একাধিকবার কারাবরণও করতে হয় তাঁকে। ১৯২৯ সালের লাহোর অধিবেশনে কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে তাঁর নেতৃত্বে ‘পূর্ণ স্বরাজ’-এর দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার পর নেহরুর সামনে ছিল এক বিরাট দায়িত্ব। দেশভাগের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, বিভিন্ন প্রান্তে দেখা দিয়েছিল অস্থিরতা। একই সঙ্গে ছিল খাদ্যসংকট, দারিদ্র্য, অশিক্ষা এবং দুর্বল অর্থনৈতিক পরিকাঠামো। এই পরিস্থিতিতে পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেয় তাঁর সরকার।
নেহরুর আমলে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা চালু হয়। ভারী শিল্প, বিদ্যুৎ, সেচ, বৃহৎ বাঁধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং উচ্চশিক্ষার পরিকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক ভারত গড়ে তোলার লক্ষ্যেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও নেহরুর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। শীতল যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন দুই শক্তিশিবিরের বাইরে থেকে ভারতকে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। জোটনিরপেক্ষতার ধারণাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের প্রতি তাঁর বিশেষ ভালোবাসার কারণে নেহরু ‘চাচা নেহরু’ নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর জন্মদিন ১৪ নভেম্বর ভারতে শিশু দিবস হিসেবে পালিত হয়।
তবে নেহরুর রাজনৈতিক জীবন বিতর্কমুক্ত ছিল না। বিশেষ করে কাশ্মীর নীতি, চিনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধ নিয়ে তাঁর সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। অর্থনৈতিক নীতি নিয়েও রয়েছে নানা মত ও বিতর্ক।
১৯৬৪ সালের ২৭ মে প্রয়াত হন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। প্রায় ১৭ বছর দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার পরও ভারতীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে তাঁর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। সমালোচনা ও বিতর্কের পাশাপাশি নেহরুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে মূল্যায়ন করলে একটি বিষয় স্পষ্ট স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, পরিকল্পিত উন্নয়ন, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্বাধীন অবস্থানের যে ভিত্তি ভারত তৈরি করেছিল, তার সঙ্গে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর নাম গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।














