দাঁতন, ইন্দ্রজিৎ সাহু: সময়ের স্রোত বয়ে গিয়েছে বহু দূর। বদলেছে শাসনব্যবস্থা, বদলেছে প্রশাসনিক কাঠামো, বদলেছে দাঁতনের চেহারাও। কিন্তু সুবর্ণরেখার তীরে আজও নীরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক ইতিহাসের সাক্ষী-দাঁতনের ব্রিটিশ আমলের পুরনো মুন্সেফ কোর্ট ভবন। একসময় যে চত্বরে প্রতিদিন বসত আদালত, চলত দেওয়ানি মামলার শুনানি, আইনজীবীদের আনাগোনায় মুখর থাকত এলাকা, আজ সেই ভবনেই নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। দীর্ঘদিনের অযত্ন ও সংরক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে এগোচ্ছে ঐতিহাসিক এই স্থাপত্য।
ওড়িশা সীমান্তবর্তী দাঁতনের ইতিহাস বহু প্রাচীন। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। ১৮০৩ সালে দেবগ্রামে মারাঠা-বর্গী ও ইংরেজদের মধ্যে সন্ধি চুক্তির পর সুবর্ণরেখা নদী বাংলা ও ওড়িশার সীমানা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সীমান্তবর্তী দাঁতনের প্রশাসনিক গুরুত্বও তখন ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেই সময় থেকেই এই অঞ্চলে প্রশাসনিক পরিকাঠামো গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয় বলে মনে করেন ইতিহাস গবেষকদের একাংশ।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই দাঁতনে গড়ে উঠেছিল মুন্সেফ কোর্ট। গবেষকদের মতে, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে, সম্ভবত সিপাহী বিদ্রোহ-পরবর্তী সময়ে এই আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ আমলে দেওয়ানি মামলার বিচার ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এই কোর্ট। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন মামলা-মোকদ্দমার কাজে। আদালত চত্বর ঘিরে গড়ে উঠেছিল আইনজীবীদের বসার ঘর, নথিপত্র সংরক্ষণের ব্যবস্থা এবং নানা প্রশাসনিক পরিকাঠামো।
কালের নিয়মে সেই ব্যস্ততার অবসান হয়েছে। স্বাধীনতার পর প্রশাসনিক পরিবর্তনের সঙ্গে আদালত অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে শুরু করে পুরনো এই ভবন। বছরের পর বছর ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন তার দেওয়াল, ছাদ ও বিভিন্ন অংশে জীর্ণতার স্পষ্ট ছাপ। কোর্ট চত্বরে থাকা উকিলদের পুরনো ঘর, দলিল-দস্তাবেজ রাখার তাক এবং একাধিক কক্ষও ভেঙে পড়ার মুখে। শুধু স্থাপত্য নয়, এই ভবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু পুরনো নথি ও দলিলও নষ্ট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ এই নথিগুলির মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে রয়েছে দাঁতনের প্রশাসনিক ইতিহাস, বিচারব্যবস্থা এবং ঔপনিবেশিক সময়ের বহু অজানা তথ্য। ইতিহাসের গবেষকদের কাছে যা হতে পারে অমূল্য সম্পদ।
গবেষক ও স্কুলশিক্ষক সন্তু জানা বলেন, “দাঁতনের মুন্সেফ আদালত একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। ব্রিটিশরা দেওয়ানি লাভ করার পর দাঁতন তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই কারণেই এখানে কোর্ট স্থাপন করা হয়। কোর্ট স্থাপনের সময়কাল সম্পর্কিত বহু তথ্য আমার সংগ্রহে রয়েছে। এই স্থাপত্যকে সংরক্ষণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের কথাতেও উঠে এসেছে একই দাবি। তাঁদের মতে, শুধু একটি পুরনো ভবন হিসেবে নয়, দাঁতনের অতীত ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেই এই স্থাপত্যকে দেখা উচিত। ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব যাচাই করে প্রত্নতাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগে সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দাঁতনের ইতিহাস তুলে ধরতে চাইলে এই ধরনের স্থাপত্যকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি বলেই মনে করছেন তাঁরা।
একসময় যেখানে ন্যায়বিচারের আশায় মানুষের ভিড় জমত, আজ সেখানে কেবল সময়ের ক্ষতচিহ্ন। ভগ্নপ্রায় দেওয়াল যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে হারিয়ে যাওয়া এক অধ্যায়ের। সুবর্ণরেখার জল প্রতিদিন বয়ে চলেছে আপন গতিতে, অথচ তার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক ভবনটি যেন অপেক্ষা করছে শেষ পরিণতির। প্রশ্ন একটাই-ইতিহাসের এই নীরব সাক্ষীকে কি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো যাবে? নাকি প্রশাসনিক উদাসীনতার অন্ধকারেই একদিন চিরতরে হারিয়ে যাবে দাঁতনের ব্রিটিশ আমলের এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন?














