মিরাট: একদিন ভালবেসে যাঁর হাত ধরে সংসার বেঁধেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই স্বামীকেই খুনের ষড়যন্ত্র! শুধু প্রাণ কেড়ে নেওয়াই নয়, অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলতে দেহ খণ্ডিত করে ভরে দেওয়া হয়েছিল নীল প্লাস্টিকের ড্রামে। তার পর সিমেন্ট ঢেলে বন্ধ করে দেওয়া হয় সেই ড্রামের মুখ। এমনকি স্বামীকে হত্যার পর প্রেমিককে সঙ্গে নিয়ে পাহাড়েও পাড়ি দিয়েছিলেন স্ত্রী! কিন্তু শেষরক্ষা হল না। উত্তরপ্রদেশের মিরাটের বহুচর্চিত ‘নীল ড্রাম’ হত্যাকাণ্ডে স্ত্রী মুসকান রস্তোগী এবং তাঁর প্রেমিক সাহিল শুক্লাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা শোনাল আদালত। বুধবার, ১৪ অক্টোবর মিরাট জেলা আদালতের বিচারক অরবিন্দ কুমার মিশ্র এই রায় ঘোষণা করেন। নিহত সৌরভ রাজপুত ছিলেন মার্চেন্ট নেভির প্রাক্তন কর্মী। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সৌরভকে খুন এবং প্রমাণ লোপাটের মামলায় মুসকান ও সাহিলকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। বুধবার ঘোষণা করা হল সাজা।
দীর্ঘ বিচারপর্বে ১২৬ বার শুনানি হয়েছে। আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন ২২ জন। একের পর এক প্রমাণ, ফরেন্সিক রিপোর্ট এবং সাক্ষীদের বয়ানের ভিত্তিতে অভিযুক্ত দু’জনের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়। যে সংসার ভালবাসা দিয়ে শুরু, সেখানেই মৃত্যুর ছায়া! ২০১৬ সালে মুসকানকে বিয়ে করেছিলেন সৌরভ। প্রেমের সম্পর্ক পরিণতি পেয়েছিল বিবাহে। নতুন সংসার, স্বপ্ন, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সবই ছিল। ২০১৯ সালে তাঁদের সংসারে আসে এক কন্যাসন্তান।
কিন্তু সময় গড়াতেই সম্পর্কে ফাটল ধরে। পুলিশি তদন্তে উঠে আসে, সৌরভের বন্ধু সাহিল শুক্লার সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন মুসকান। সেই সম্পর্ককে কেন্দ্র করে দাম্পত্যে অশান্তি শুরু হয়। বিচ্ছেদের কথাবার্তাও উঠেছিল। যদিও মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন সৌরভ। কর্মসূত্রে বিদেশে থাকতেন তিনি। ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরেন। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিকল্পনাও ছিল তাঁর। অথচ কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়।
খাবারে চেতনানাশক, তার পর ছুরির আঘাত! তদন্তে ভয়ঙ্কর তথ্য। পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ মার্চ মিরাটের ইন্দ্রনগরের বাড়িতে সৌরভের খাবারে চেতনানাশক মিশিয়ে তাঁকে অচেতন করে দেওয়া হয়। অভিযোগ, সেই পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিলেন স্ত্রী মুসকান। এর পর বাড়িতে আসেন সাহিল। তদন্তকারীদের দাবি, অচেতন অবস্থাতেই সৌরভকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। কিন্তু খুনের পরেও থামেননি দু’জনে। অপরাধের প্রমাণ লোপাট করতে তাঁর দেহ খণ্ডিত করে একটি বড় নীল প্লাস্টিকের ড্রামে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। তার পর ড্রামের ভিতরে ঢালা হয় সিমেন্ট, বালি এবং জলের মিশ্রণ। উদ্দেশ্য একটাই যাতে সহজে কারও নজরে না আসে দেহ!
আর সেই ড্রামই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল গোটা হত্যাকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। স্বামীর দেহ ড্রামে, প্রেমিককে নিয়ে পাহাড়ে! তদন্তে উঠে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। সৌরভকে হত্যার পর সাহিলের সঙ্গে হিমাচল প্রদেশে চলে যান মুসকান। অন্য দিকে, সৌরভের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন তাঁর পরিবারের সদস্যেরা। ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া না মেলায় সন্দেহ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছে বিষয়টি পৌঁছয়।
তদন্তে নেমে একের পর এক সূত্র জোড়া লাগাতে শুরু করেন তদন্তকারীরা। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় সিমেন্টে বন্ধ করে রাখা নীল ড্রাম। সেই ড্রামের ভিতর থেকেই মেলে সৌরভের দেহাবশেষ। ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আসতেই কার্যত শিউরে উঠেছিল গোটা দেশ। গ্রেফতার করা হয় মুসকান এবং সাহিলকে। ২২ সাক্ষী, ১২৬ শুনানি! আদালতে ভেঙে পড়ল অপরাধ আড়ালের চেষ্টা মামলার তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পায় নীল ড্রাম, ফরেন্সিক পরীক্ষার রিপোর্ট এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ। আদালতে সেই সব তথ্য তুলে ধরে সরকারি পক্ষ।
বিচারক জানান, এই ধরনের পরিকল্পিত অপরাধ সমাজে আতঙ্ক তৈরি করে। অপরাধের ভয়াবহতা এবং প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা বিবেচনা করেই মৃত্যুদণ্ডের সাজা ঘোষণা করা হয়। আদালতে মহাভারতের প্রসঙ্গও উঠে আসে। সরকারি আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিচারক উল্লেখ করেন, অপরাধের গুরুত্ব অনুসারে দোষীকে শাস্তি দেওয়াও ন্যায় প্রতিষ্ঠার অন্যতম দায়িত্ব। এদিন কারাগার থেকেই ভিডিয়ো কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়ায় যোগ দেন মুসকান ও সাহিল। সাজা ঘোষণার আগে নিজেদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ পেয়েছিলেন দু’জনেই। ‘একসঙ্গে থাকতে না চাইলে আলাদা হও, কিন্তু কাউকে খুন কেন?’
আদালতের রায় ঘোষণার পর আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন সৌরভের মা রেণু রাজপুত। ছেলের মৃত্যুর বিচার চেয়ে দীর্ঘদিন লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক না টিকলে আলাদা হয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই কারণে কাউকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। ছেলেকে হারানোর যন্ত্রণা বুকে নিয়েই অভিযুক্তদের কঠোরতম শাস্তির দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, মুসকানের বাবা-মাও মেয়ের মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করবেন না বলে আগেই লিখিত ভাবে জানিয়েছিলেন। বুধবার জেলা আদালতের রায় ঘোষণার পর সৌরভের পরিবারের সদস্যেরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। আদালত চত্বরেও দেখা যায় উচ্ছ্বাস।
তবে জেলা আদালতে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা হলেও আইন অনুযায়ী তা কার্যকর করার আগে হাইকোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন। উচ্চ আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করার সুযোগও রয়েছে দণ্ডিতদের। একদিকে স্বামীকে হত্যার ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে দেহ লুকিয়ে অপরাধ আড়ালের মরিয়া চেষ্টা। কিন্তু যে নীল ড্রাম দিয়ে সত্য চাপা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই ড্রামই খুলে দেয় হত্যাকাণ্ডের রহস্যের জট। দীর্ঘ আদালতি লড়াইয়ের পর মুসকান ও সাহিলের মৃত্যুদণ্ডের রায়ে ফের আলোচনার কেন্দ্রে মিরাটের সেই ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড।














