Sabangbulletin: ট্রেনের হুইসেল, রেলের বিশাল ওয়ার্কশপ, ব্যস্ত জংশন ‘খড়গপুর’ বললেই আজ চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক চেনা রেলশহরের ছবি। কিন্তু এই শহরের পরিচয় কি শুধুই রেলকে ঘিরে? নাকি রেলের শহর হয়ে ওঠার বহু আগেই এই মাটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কোনও প্রাচীন ইতিহাস? ‘খড়গপুর’ নামটির উৎপত্তি কোথা থেকে এই প্রশ্নের উত্তর আজও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে একাধিক মত, আর সেই মতের কেন্দ্রে রয়েছে রাজা, প্রাচীন শিবমন্দির এবং নানা লোককথা।
খড়গপুরের ইন্দা অঞ্চলে রয়েছে প্রাচীন খড়্গেশ্বর শিবমন্দির। এই মন্দিরকে ঘিরেই খড়গপুর নামের উৎপত্তি নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত মত রয়েছে। পুরনো ভ্রমণবিবরণীতেও খড়্গেশ্বর মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে একাধিক মতের কথা বলা হয়েছে। কোনও মতে রাজা খড়্গসিংহ, আবার কোনও মতে বিষ্ণুপুরের রাজা খড়্গমল্লের সঙ্গে মন্দিরটির যোগ রয়েছে। সেখান থেকেই একটি ধারণা তৈরি হয়েছে ‘খড়্গেশ্বর’ নাম থেকেই কোনওভাবে ‘খড়্গপুর’ নামের প্রচলন হয়ে থাকতে পারে।
আরেকটি মত সরাসরি খড়গপুরের নামকে যুক্ত করে মল্লভূমের রাজা খড়্গমল্লের সঙ্গে। প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, খড়্গমল্ল এই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর নাম থেকেই ‘খড়্গপুর’ নামের উৎপত্তি হতে পারে বলে মনে করা হয়। তবে এই মতটিও সর্বসম্মত নয়। ফলে ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিতে বিষয়টি এখনও গবেষণা ও বিতর্কের জায়গা।খড়গপুরের প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে আরও একটি আকর্ষণীয় লোককথা জড়িয়ে রয়েছে। কথিত আছে, পাণ্ডবদের বনবাসের সময় এই অঞ্চলে ভীমের সঙ্গে হিড়িম্বের সংঘর্ষ হয়েছিল। খড়্গেশ্বর মন্দির সংলগ্ন এলাকার সঙ্গে হিড়িম্বডাঙ্গা নামটির যোগসূত্র নিয়েও পুরনো বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এগুলিকে প্রমাণিত ইতিহাসের বদলে স্থানীয় লোকবিশ্বাস ও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেই দেখা হয়।
আজ খড়গপুর মানেই রেল। বিশাল রেলওয়ে ওয়ার্কশপ, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল জংশন এবং রেলকেন্দ্রিক জনজীবন শহরটির পরিচয়কে একেবারে বদলে দিয়েছে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, রেলই খড়গপুর নামের জন্ম দেয়নি। রেলকে কেন্দ্র করে শহরের আধুনিক বিকাশ ঘটেছে অনেক পরে। অর্থাৎ, আজকের ‘রেলশহর’ খড়গপুরের অতীতের শিকড় আরও গভীরে। খড়গপুর নামের উৎপত্তি নিয়ে খড়্গেশ্বর মন্দির, রাজা খড়্গমল্ল এবং রাজা খড়্গসিংহ একাধিক সূত্র ও মত সামনে আসে।
কোনটি একেবারে নির্ভুল, তা নিয়ে নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঐকমত্য নেই। তবে এ কথা স্পষ্ট, খড়গপুরের ইতিহাস শুধু রেলকে ঘিরে নয়। রেলের ব্যস্ততার আড়ালে এই শহরের মাটিতে লুকিয়ে রয়েছে প্রাচীন মন্দির, রাজাদের কাহিনি, লোকবিশ্বাস এবং বহু পুরনো স্মৃতি। হয়তো সেই কারণেই খড়গপুর শুধু একটি রেলশহর নয়, এটি এমন এক শহর, যার নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ইতিহাসের এক গল্প।














