নিজস্ব সংবাদদাতা, সবং: ইতিহাস শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় নয়, তাকে জানতে হয়, বুঝতে হয়, অনুভবও করতে হয়। আর সেই ইতিহাস যদি হয় আত্মত্যাগ, মানবিকতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামের, তা হলে তার গুরুত্ব আরও গভীর। শিখ ধর্মের নবম গুরু তেগ বাহাদুরের ৩৫০তম আত্মবলিদান স্মরণে তেমনই এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগের সাক্ষী থাকল পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং। ছয় শতাধিক পড়ুয়ার হাতে জ্বলে উঠল শ্রদ্ধার প্রদীপ। কোথাও রঙ্গোলি, কোথাও ছবি আঁকা, আবার কোথাও পুতুলনাট্যের মাধ্যমে বন্ধুত্বের পাঠ। সব মিলিয়ে উৎসবের আবহে ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে নতুন করে চিনল খুদে পড়ুয়ারা।
ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধীনস্থ সেন্টার ফর কালচারাল রিসোর্সেস অ্যান্ড ট্রেনিং (সিসিআরটি)-এর ব্যবস্থাপনায় দেশজুড়ে গুরু তেগ বাহাদুরের ৩৫০তম আত্মবলিদান স্মরণে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা রিসোর্স পার্সনদের তত্ত্বাবধানে চলছে নানা শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। সেই কর্মসূচির অঙ্গ হিসেবেই পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডিস্ট্রিক্ট রিসোর্স পার্সন (ডিআরপি) অরিজিৎ দাস অধিকারীর তত্ত্বাবধানে সবংয়ের আদাসিমলা দেশপ্রাণ বিদ্যাপীঠ এবং আশাপুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আয়োজিত হল বিশেষ কর্মশালা।
কর্মশালার উদ্বোধন করেন পাঞ্জাবের শিখ শিক্ষক হরিন্দর সিং। গুরু তেগ বাহাদুরের জীবন, আদর্শ ও আত্মত্যাগের নানা ঘটনা পড়ুয়াদের সামনে তুলে ধরেন তিনি। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষায় শিখ ধর্মগুরুর ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায় শিক্ষার্থীরা।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ছয় শতাধিক ছাত্রছাত্রীর অংশগ্রহণে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বলন। গুরু তেগ বাহাদুরের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় তারা। শুধু আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন নয়, স্মৃতিকে স্থায়ী করে রাখতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রোপণ করা হয় একটি তমাল গাছ। স্মারক বৃক্ষরোপণের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল হওয়ার বার্তাও পৌঁছে দেওয়া হয় নতুন প্রজন্মের কাছে।
পাশাপাশি রঙ্গোলি তৈরি, চিত্রাঙ্কন, কুইজ, প্রবন্ধ রচনা এবং তাৎক্ষণিক বক্তৃতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় পড়ুয়ারা। নিজেদের মেধা ও সৃজনশীলতা তুলে ধরার সুযোগ পেয়ে তাদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিযোগিতায় সফলদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার। বিশেষ আকর্ষণ ছিল ‘দুই বন্ধু’ শীর্ষক পুতুলনাট্য। গল্পের ছলে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও মানবিক সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরা হয় সেখানে।
আদাসিমলা দেশপ্রাণ বিদ্যাপীঠের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সোমেষ দাস বলেন, ‘‘এই ধরনের ব্যতিক্রমী কর্মশালায় আমরাও সমৃদ্ধ হলাম। ভারতীয় ঐতিহ্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক ছাত্রছাত্রীদের সামনে উঠে এল।’’ তাঁর মতে, প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি এমন উদ্যোগ পড়ুয়াদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে সাহায্য করে।
আশাপুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক অনুপম বেরা জানান, এই ধরনের কর্মশালা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে সহায়ক হতে পারে। তাঁর কথায়, পড়ুয়াদের আবেগ, আগ্রহ এবং স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই এই আয়োজনের অন্যতম প্রাপ্তি।
ছোটদের বিভাগে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে অন্বেষা সাঁতরা। পুরস্কার পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি নতুন কিছু শেখার অভিজ্ঞতাও তার কাছে বিশেষ প্রাপ্তি। অন্বেষা জানায়, চেনা শ্রেণিকক্ষের বাইরে এসে নতুন বিষয় জানা, নিজের ভাবনা প্রকাশ করা এবং পুরস্কৃত হওয়ার অভিজ্ঞতা তার ভীষণ ভাল লেগেছে।
চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে নবম শ্রেণির ছাত্রী ঈশিতা গুছাইত। অভিনব এই আয়োজনে অংশ নিয়ে পুরস্কার পাওয়ায় উচ্ছ্বসিত সেও। বিশেষ করে ‘দুই বন্ধু’ পুতুলনাট্য তার মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। ওই নাটক থেকে বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছে বলে জানায় ঈশিতা।
শিক্ষক কমলকান্ত খাটুয়ার বক্তব্য, ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মকে যুক্ত করতে কেন্দ্রীয় সরকারের এই প্রয়াস ফলপ্রসূ হবে বলেই তাঁর বিশ্বাস। ‘শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির মেলবন্ধন ছাড়া কোনও শিক্ষাই সম্পূর্ণ নয়’ জেলার ডিস্ট্রিক্ট রিসোর্স পার্সন অরিজিৎ দাস অধিকারীর কথায়, ‘‘শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির মেলবন্ধন ছাড়া কোনও শিক্ষাই সম্পূর্ণ নয়।’’ তাঁর মতে, দেশের গৌরবময় অতীতের সঙ্গে প্রগতিশীল বর্তমানের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে।
তিনি জানান, ভারতকে বিশ্বসভায় শ্রেষ্ঠ আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে দেশের ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। শুধু জানলেই হবে না, সেই মূল্যবোধ জীবনে আত্মস্থ করাও জরুরি। গুরু তেগ বাহাদুরের মতো মহাপুরুষদের জীবনদর্শন শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ এবং মানবিকতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। এক দিকে সাড়ে তিনশো বছর আগের আত্মত্যাগের ইতিহাস, অন্য দিকে একবিংশ শতাব্দীর পড়ুয়াদের সৃজনশীল অংশগ্রহণ। সবংয়ের দুই বিদ্যালয়ের এই কর্মশালা যেন সেই দুই সময়ের মধ্যে গড়ে দিল এক নতুন সেতুবন্ধন। মঙ্গলপ্রদীপের আলো নিভে গেলেও পড়ুয়াদের মনে থেকে গেল এক গভীর শিক্ষা মানুষের প্রতি ভালবাসা, সহিষ্ণুতা আর আত্মত্যাগের আদর্শই প্রকৃত শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি।














