প্রথম পাতারাজনীতিপশ্চিমবঙ্গকলকাতাদেশআন্তর্জাতিকবিনোদনখেলালাইফস্টাইলআবহাওয়াভাইরালচাকরিবাজারদরবিজ্ঞান প্রযুক্তিস্বাস্থ্যঐতিহাসিক
---Advertisement---

মহিষাসুরের জন্য ঘরে তৈরি সুরা! দাঁতনের রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় লুকিয়ে কোন ইতিহাস?

Published on: October 12, 2026
---Advertisement---

ইন্দ্রজিৎ সাহু: দুর্গাপুজো মানেই শুধু ঢাকের বাদ্যি, ধুনুচি নাচ কিংবা প্রতিমা দর্শন নয়। বাংলার আনাচকানাচে ছড়িয়ে রয়েছে এমন বহু প্রাচীন পুজো, যার পরতে পরতে জড়িয়ে ইতিহাস, লোককথা আর রাজকীয় ঐতিহ্য। তেমনই এক পুজোর সন্ধান মেলে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাঁতনের খণ্ডরুই রাজবাড়িতে। প্রায় পাঁচশো বছরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ দেবীর মাছভোগ। সপ্তমী থেকে নবমী, প্রতিদিনই দেবীর পাতে পড়ে নানা প্রজাতির মাছ। নবমীতে ইলিশ, চিংড়ি, ভেটকি থেকে রুই-কাতলা-বাদ যায় না কিছুই! শুধু তাই নয়, প্রাচীন প্রথা মেনে মহিষাসুরের উদ্দেশে থাকে বাড়িতে তৈরি সুরার ব্যবস্থাও। সময়ের সঙ্গে বহু কিছু বদলে গেলেও আজও স্বমহিমায় টিকে রয়েছে রাজবাড়ির পুজোর স্বতন্ত্র রীতিনীতি।

খণ্ডরুই রাজবাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরীর গজপতি রাজাদের নাম। রাজপরিবারে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, আনুমানিক পাঁচশো বছর আগে এই এলাকার নাম ছিল ‘তুরকাচৌর পরগনা’। সেই সময় এখানে রাজত্ব করতেন এক তেলেঙ্গি রাজা। তিনি ওড়িশার পুরীর গজপতি রাজাকে নিয়মিত কর দিতেন। কিন্তু এক সময় সেই কর দিতে অস্বীকার করেন তিনি। আর তা নিয়েই শুরু হয় সংঘাত। কথিত আছে, কর দিতে অস্বীকার করায় তেলেঙ্গি রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন পুরীর গজপতি রাজা। যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয় তাঁর অন্যতম সেনাপতি কৃষ্ণচন্দ্র দাসকে। যুদ্ধে জয়লাভ করেন কৃষ্ণচন্দ্র। তাঁর বীরত্ব ও সাফল্যে সন্তুষ্ট হয়ে গজপতি রাজা তাঁকেই ওই এলাকার রাজা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকেই খণ্ডরুইয়ে কৃষ্ণচন্দ্র দাসের রাজবংশের যাত্রা শুরু বলে পরিবারের দাবি। পরবর্তী সময়ে বংশপরম্পরায় এগিয়ে চলে রাজপরিবারের ঐতিহ্য।

এই রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য মাছভোগ। পরিবারের প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, তৎকালীন তেলেঙ্গি রাজা ছিলেন ব্রাহ্মণ। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা সেই পুজোর রীতি আজও বজায় রেখেছেন রাজপরিবারের সদস্যেরা। এখানে দেবীর আরাধনা হয় ওড়িশার ‘বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত’ মতে। প্রতিপদ থেকেই শুরু হয় পুজোর আনুষ্ঠানিকতা। টানা দশ দিন ধরে চলে দেবীর আরাধনা। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিন দিনই দেবী দুর্গাকে আলাদা আলাদা ধরনের মাছ রান্না করে ভোগ নিবেদন করা হয়। তবে নবমীর আয়োজন সবচেয়ে আকর্ষণীয়। ওই দিন দেবীর পাতে সাজানো হয় চিংড়ি, ইলিশ, ভেটকি, রুই, কাতলা-সহ নানা প্রজাতির মাছ। এমনকি রাজবাড়ির প্রাচীন কুণ্ডপুকুর থেকে মাছ ধরে তা রান্না করে দেবীকে নিবেদন করার রীতিও রয়েছে। রাজপরিবারের সদস্যদের কাছে এটি নিছক ভোগের আয়োজন নয়, বরং পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া এক অমূল্য ঐতিহ্য।

দেবীর মাছভোগের পাশাপাশি আরও একটি ব্যতিক্রমী প্রথা রয়েছে এই রাজবাড়িতে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত মহিষাসুরের উদ্দেশে বাড়িতে তৈরি সুরার ব্যবস্থা রাখা হয়। রাজবাড়ির প্রাচীন পুজোপদ্ধতির অন্যতম অংশ হিসাবেই এই রীতি পালন করা হয়ে থাকে। একসময় এই পুজোয় পশুবলির প্রচলনও ছিল। পরিবারের বিবরণ অনুযায়ী, সপ্তমী ও অষ্টমীতে একটি করে মহিষ ও ছাগল বলি দেওয়া হত। নবমীতে সেই বলির সংখ্যা আরও বেড়ে যেত। তবে সময়ের সঙ্গে সেই প্রথায় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে পশুবলি সম্পূর্ণ বন্ধ। পরিবর্তে চালকুমড়ো বলি দিয়েই রক্ষা করা হয় প্রাচীন রীতির প্রতীকী ঐতিহ্য।

পুজোর দশ দিন খণ্ডরুই রাজবাড়ি যেন ফিরে যায় এক অন্য সময়ে। প্রতিদিন ঢাকের বাদ্যি, সানাইয়ের সুর এবং দেবীর সামনে চণ্ডীমঙ্গলের গান এক অনন্য আবহ তৈরি করে। প্রাচীন রাজবাড়ির পরিবেশে এই আচার-অনুষ্ঠান দেখতে হাজির হন গ্রামের বাসিন্দারা। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও আসেন বহু মানুষ। শুধু দুর্গাপুজোই নয়, খণ্ডরুই রাজবাড়ির ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন পরিবারের কুলদেবতা রাধাবল্লভ জিউ। রাজবাড়ির প্রাচীন টেরাকোটা মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন তিনি। সেখানে প্রতিদিন নিয়ম মেনে পুজো ও ভোগ নিবেদন করা হয়। দুর্গাপুজোর উৎসবের মধ্যেও অটুট থাকে সেই নিত্যসেবা।

দশমীতে দেবীবরণের মধ্য দিয়ে উৎসব পৌঁছয় অন্য মাত্রায়। রাজবাড়ির মহিলারা মেতে ওঠেন সিঁদুর খেলায়। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং গ্রামের বহু মহিলা। একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে শুভেচ্ছা জানান তাঁরা। রাজবাড়ির পারিবারিক উৎসব তখন হয়ে ওঠে সকলের মিলনমেলা। রাজত্ব নেই, নেই অতীতের সেই জৌলুস। বদলে গিয়েছে সময়, সমাজ এবং পুজোর বহু আচার। তবুও হারিয়ে যায়নি খণ্ডরুই রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর নিজস্ব পরিচয়। পাঁচশো বছরের ইতিহাসের স্মৃতি, গজপতি রাজার সেনাপতির যুদ্ধজয়ের লোককথা, প্রাচীন টেরাকোটা মন্দির, মাছভোগ আর সানাইয়ের সুর সব মিলিয়ে দাঁতনের এই রাজবাড়ির দুর্গাপুজো আজও বহন করে চলেছে বাংলার সঙ্গে ওড়িশার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক স্বতন্ত্র অধ্যায়। যেখানে রাজত্ব আজ ইতিহাস, কিন্তু দেবীর আরাধনায় আজও বেঁচে রয়েছে রাজকীয় ঐতিহ্য।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now