ইন্দ্রজিৎ সাহু: একসময় ছিল জমিদারি। ছিল প্রতিপত্তি, আভিজাত্য আর বনেদিয়ানার ছাপ। আজ আর সেই জমিদারি নেই। সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়েছে অনেক কিছুই। কিন্তু বদলায়নি পূর্বপুরুষের হাতে শুরু হওয়া দুর্গাপুজোর রীতিনীতি। প্রায় পৌনে দু’শো বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে আজও একই নিষ্ঠা ও ভক্তিতে দেবী দুর্গার আরাধনা করে আসছে পশ্চিম মেদিনীপুরের লোয়াদার ফতেবাড় দে পরিবার। ১৭৭ বছরের এই দুর্গোৎসবের বিশেষত্বও কম নয়। এখানে পশুবলি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বৈষ্ণব মতে হয় পুজো। এমনকি বাইরে থেকে প্রতিমা আনানোর পরিবর্তে পরিবারের সদস্যই নিজের হাতে গড়ে তোলেন মা দুর্গাকে।
জমিদারের হাত ধরে শুরু হয়েছিল যে পুজো, আজ তা এক পরিবারের আবেগের ইতিহাস। দে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানা যায়, ১২৫৬ বঙ্গাব্দে তৎকালীন জমিদার মধুসূদন দে প্রথম দুর্গাপুজোর শুভসূচনা করেন। পরবর্তীকালে দাড়িকানাথ দে সেই পুজোকে প্রতিষ্ঠিত রূপ দেন। তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। কালের নিয়মে হারিয়ে গিয়েছে জমিদারি প্রথা। কিন্তু দুর্গাপুজোর আচার-অনুষ্ঠানে কোনও ছেদ পড়েনি। বংশপরম্পরায় আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে সেই ঐতিহ্য।
এই বাড়ির পুজোর অন্যতম আকর্ষণ প্রতিমা নির্মাণ। সাধারণত দুর্গাপুজোয় মৃৎশিল্পীদের তৈরি প্রতিমা মণ্ডপে বা বাড়িতে এনে পুজোর আয়োজন করা হয়। কিন্তু ফতেবাড় দে পরিবারের রীতি অন্য রকম। পরিবারের সদস্য বিশ্বনাথ দে বছরের পর বছর ধরে নিজের হাতেই তৈরি করে আসছেন দুর্গাপ্রতিমা। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে মাটির অবয়বে ফুটে ওঠে দেবীর রূপ। পরিবারের কাছে প্রতিমা নির্মাণ কেবল একটি কাজ নয়, বরং পূর্বপুরুষদের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার এক বিশেষ অঙ্গীকার।
প্রাচীন পুজো, অথচ নেই পশুবলির রীতি! দে বাড়ির দুর্গোৎসবের আরও একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল বৈষ্ণব মতে দেবীর আরাধনা। এই পরিবারে পশুবলি প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শতাব্দীপ্রাচীন পুজো হলেও সেই নিয়মে কোনও পরিবর্তন আসেনি। নিষ্ঠা, ভক্তি এবং পারিবারিক আচার মেনেই সম্পন্ন হয় দেবীর পুজো।
মহালয়ার পরের দিন, অর্থাৎ প্রতিপদ তিথি থেকেই শুরু হয়ে যায় দে বাড়ির পুজোর আচার। প্রথমে আরাধনা করা হয় পরিবারের কুলদেবতা লক্ষ্মীজনার্দনের। ষষ্ঠীতে ঘট উত্তোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দুর্গাপুজোর মূল পর্ব। সপ্তমীতে নবপত্রিকার পুজো, অষ্টমীতে সন্ধিপুজো এবং নবমীতে নারায়ণের পুজো হয়। প্রতিটি আচারেই মেনে চলা হয় পরিবারের পূর্বপুরুষদের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম।
শুধু পুজোর রীতিনীতি নয়, প্রসাদের আয়োজনেও রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য। পুজোর দিনগুলিতে প্রতিদিন ঘিয়ে ভাজা লুচি-সহ বিশেষ প্রসাদের আয়োজন করা হয়। পরিবারের কাছে এই প্রসাদ যেমন দেবীর প্রতি নিবেদন, তেমনই বহু বছরের পুরনো এক রীতিকে ধরে রাখার মাধ্যম।
দুর্গাপুজো মানেই এই বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের মিলনমেলা। বছরের অন্য সময় যে যেখানেই থাকুন না কেন, পুজোর কয়েকটি দিনে পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করেন। বাড়িজুড়ে জমে ওঠে গল্প, আড্ডা আর আনন্দ। ছোটদের হইচই, বড়দের স্মৃতিচারণা এবং দেবী আরাধনার মধ্য দিয়ে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় প্রাচীন বাড়িটি।
দশমীতে সেই আনন্দের আবহেই নেমে আসে বিদায়ের বিষাদ। দেবীবরণের পাশাপাশি সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন পরিবারের মহিলারা। একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে মঙ্গলকামনা করেন তাঁরা। এরপর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে কয়েক দিনের উৎসবের। আবার শুরু হয় এক বছরের প্রতীক্ষা।
বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন পরিবারের সদস্য শমুনাথ দে। পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া রীতিনীতি অক্ষুণ্ণ রেখে পুজো চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি এবং পরিবারের অন্য সদস্যেরা। নতুন প্রজন্মের হাতেও সেই ঐতিহ্য তুলে দেওয়াই তাঁদের লক্ষ্য।
জমিদারি আজ অতীত। কিন্তু অতীত হয়ে যায়নি জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজো। ১৭৭ বছর ধরে চলে আসা এই উৎসব আজও মনে করিয়ে দেয়, ঐতিহ্য বেঁচে থাকে মানুষের বিশ্বাস, আবেগ আর পারিবারিক বন্ধনের মধ্য দিয়ে। লোয়াদার ফতেবাড় দে বাড়িতে তাই দুর্গাপুজো শুধুই দেবীর আরাধনা নয়, একদিকে ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার উৎসব।













