ইন্দ্রজিৎ সাহু, সবংঃ “শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা-ছাতা ভরসা।” একসময় এই স্লোগান শুধু বিজ্ঞাপনের পরিচিত লাইন ছিল না, ছাতা ছিল মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সঙ্গী। ছাতা ছিঁড়লে কিংবা শিক ভেঙে গেলে নতুন ছাতা কেনার আগে সারানোর কথাই ভাবতেন মানুষ। আর সেই প্রয়োজন মেটাতে সাইকেলে সরঞ্জাম নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন ছাতা সারানোর কারিগররা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়েছে সেই ছবিটা। বাজারে মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যেই মিলছে হরেক রকমের নতুন ছাতা। আর সস্তার নতুন ছাতার দাপটেই ক্রমশ অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে ছাতা সারানোর পুরনো পেশা।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর ব্লকের গোকুলপুর এলাকার ছাতা সারানোর কারিগরদের একসময় যথেষ্ট নামডাক ছিল। বর্ষা নামলেই তাঁদের সাইকেলের ঘণ্টির সঙ্গে ভেসে আসত পরিচিত ডাক “ছাতা সারান, ছাতা সারান।” কাঁধে বা সাইকেলে ঝোলানো থাকত ছাতা সারানোর নানা সরঞ্জাম। প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সবং, পিংলা, নারায়ণগড়, খড়গপুর সহ একাধিক এলাকায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে নষ্ট ছাতা মেরামত করতেন তাঁরা।
একসময় এই পেশা থেকেই দৈনিক গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত আয় হত। বর্ষার মরশুমে কাজের চাপ থাকত সবচেয়ে বেশি। ছাতার শিক ভাঙা, কাপড়ের ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সমস্যা সবই দক্ষ হাতে সারিয়ে দিতেন তাঁরা। তাঁদের হাতের কাজেই বছরের পর বছর পুরনো ছাতা নতুনের মতো ব্যবহার করতেন বহু মানুষ।
কিন্তু এখন সেই দিন আর নেই। বাজারে কম দামে রকমারি নতুন ছাতা সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। ৫০-১০০ টাকার মধ্যেই যখন নতুন ছাতা মিলছে, তখন পুরনো ছাতা সারাতে ৫০ টাকা খরচ করতেও অনেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন। ফলে কাজের জন্য দীর্ঘ পথ ঘুরেও আগের মতো ক্রেতার দেখা মিলছে না।
কারিগরদের দাবি, আগে যেখানে প্রতিদিন ৩০০-৪০০ টাকা পর্যন্ত আয় হত, বর্তমানে সেখানে সারাদিন ঘুরে ১৫০-২০০ টাকা রোজগার করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তার উপর রয়েছে সাইকেলে দীর্ঘ পথ যাতায়াত, সরঞ্জামের খরচ এবং সময়ের মূল্য। ফলে এই পেশার উপর নির্ভর করে সংসার চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। কারিগরদের কথায়, “আগে মানুষ ছাতা সারিয়ে বছরের পর বছর ব্যবহার করতেন। এখন সামান্য সমস্যা হলেই নতুন ছাতা কিনে নেন। ফলে আমাদের কাজ দিন দিন কমছে।”
শুধু কয়েকজন কারিগরের রোজগার কমে যাওয়া নয়, এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার এক পরিচিত পেশার ঐতিহ্যও। একসময় বর্ষা এলেই যাঁদের ডাক শোনা যেত পাড়ায় পাড়ায়, আজ তাঁরাই কাজের সন্ধানে দূর-দূরান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সস্তার নতুন ছাতার বাজার হয়তো ক্রেতাদের সুবিধা বাড়িয়েছে, কিন্তু তার আঘাত এসে পড়েছে বহু পুরনো কারিগরের জীবিকায়। তাই প্রশ্ন একটাই একদিন যে পেশার সঙ্গে বর্ষার স্মৃতি জড়িয়ে ছিল, সেই ছাতা সারানোর কারিগরদের পরিচিত ডাক কি এবার সত্যিই হারিয়ে যাবে সময়ের ভিড়ে?











