নিজস্ব সংবাদদাতা, সবং: একদিকে টানা বৃষ্টিতে জলবন্দি সবংয়ের মানুষ, অন্যদিকে সেই দুর্যোগের মাঝেই সরকারি ত্রাণ বিতরণ ঘিরে তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা। দশগ্রাম, সারতা, বিষ্ণুপুর, বলপাই-সহ একাধিক এলাকা এখনও জলের তলায়। কোথাও বাড়ির উঠোনে জল, কোথাও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের হাতে পৌঁছনোর কথা ত্রাণ। কিন্তু সবংয়ের বিষ্ণুপুর অঞ্চলের কুলভেড়ীতে ত্রাণ বিলির একটি ছবি সামনে আসতেই উঠেছে ‘সরকারি ত্রাণে দলীয় ছাপ’-এর বিস্ফোরক অভিযোগ।
অভিযোগের কেন্দ্রে সরকারি স্টিকার লাগানো ত্রিপল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বিজেপির সবং মণ্ডল-৩ সভাপতি নিতাই চাঁদ মণ্ডল এবং বিজেপির ঘাটাল সাংগঠনিক জেলার সহ-সভাপতি শিশির কুলবি এক গ্রামবাসীর হাতে ত্রিপল তুলে দিচ্ছেন। ছবিটি নিতাই চাঁদ মণ্ডল নিজেই ফেসবুকে পোস্ট করেন বলে দাবি। আর সেখানেই আরও বড় বিতর্ক। প্রথম পোস্টে ক্যাপশনে লেখা হয়েছিল “ভারতীয় জনতা পার্টির সবং মণ্ডল ৩-এর পক্ষ থেকে ১৩ নম্বর বিষ্ণুপুরের কুলভেড়ী বুথে ত্রাণ তুলে দেওয়া হলো।” পরে সেই ক্যাপশন বদলে লেখা হয় “সবং মণ্ডল-৩-এর পক্ষ থেকে প্রশাসনের উদ্যোগে ত্রাণ বণ্টন করা হল।” কেন বদলাল ক্যাপশন? প্রথমে যদি বিজেপির পক্ষ থেকে ত্রাণ বিলির কথা বলা হয়, পরে কেন সেখানে এল ‘প্রশাসনের উদ্যোগ’-এর কথা? এই প্রশ্নেই এখন সরগরম সবংয়ের রাজনৈতিক মহল। আরও প্রশ্ন উঠেছে ত্রাণ বণ্টনের পদ্ধতি নিয়েও। সরকারি ত্রাণ হলে প্রশাসনের আধিকারিক, পঞ্চায়েত প্রতিনিধি কিংবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি কোথায়? আর যদি এটি দলীয়ভাবে সংগৃহীত ত্রাণ হয়, তাহলে ত্রিপলে সরকারি স্টিকার এল কীভাবে?
ঘটনায় সরব বিরোধীরা। প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক চিরঞ্জিব ভৌমিকের অভিযোগ, “সরকারি স্ট্যাম্প বা স্টিকার লাগানো ত্রাণ কোনও দলীয় নেতা বিলি করতে পারেন না। বিজেপি নেতৃত্ব যদি সরকারি জিনিসপত্র বিলি করে থাকে, তাহলে কী ধরনের সরকার চলছে, তা বোঝাই যাচ্ছে। প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে দলীয়তন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হচ্ছে।” সিপিআইএম নেতা চন্দন গুছাইতেরও প্রশ্ন, “সরকারি স্টিকার লাগানো ত্রিপল দলীয় নেতারা বিলি করবেন কেন? সরকারি ত্রাণ বিজেপির বুথ স্তরের নেতাদের হাতে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকৃত প্রাপকরা ত্রাণ পাবেন কি না, তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।”
তবে সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন বিজেপির ঘাটাল সাংগঠনিক জেলা সহ-সভাপতি শিশির কুলবি। তাঁর দাবি, “আমাদের কাছে সার্বিকভাবে কিছু কালেকশন মাল এসেছিল। আমরা দিয়েছি। এটা সরকারি নয়।” তাহলে প্রশ্ন আরও জোরালো যদি ত্রাণ সরকারি না-ই হয়, সরকারি স্টিকার লাগানো ত্রিপল এল কোথা থেকে? আর যদি প্রশাসনের উদ্যোগেই ত্রাণ বণ্টন হয়ে থাকে, তাহলে বিজেপির নেতাদের হাতে সেই ত্রাণ কেন?
দুর্যোগের সময়ে ত্রাণ কোনও রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয় এটি বিপন্ন মানুষের অধিকার। তাই কুলভেড়ীর ঘটনায় এখন নজর একটাই দিকে সরকারি ত্রাণের হিসাব কি প্রকাশ্যে আসবে? প্রশাসন কি জানাবে, ওই ত্রিপল কোথা থেকে এসেছিল এবং কার বরাদ্দে এসেছিল? জলবন্দি মানুষের পাশে ত্রাণ পৌঁছনোর কথা ছিল নিরপেক্ষ প্রশাসনের। কিন্তু কুলভেড়ীর ছবি সেই ত্রাণের গায়ে তুলে দিয়েছে রাজনীতির ছাপের প্রশ্ন। ত্রাণের প্যাকেটে কার স্টিকার, আর কার হাতে ত্রাণ এই দুই প্রশ্নের উত্তরেই এখন লুকিয়ে রয়েছে আসল বিতর্ক।











