নিজস্ব সংবাদদাতা, পশ্চিম মেদিনীপুর: রেস্তোরাঁ ও হোটেলে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কলের ছাড়পত্র নিয়ে এবার বড় বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যের প্রায় ৭৫ শতাংশ রেস্তোরাঁতেই দমকলের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নেই। তবে এক ধাক্কায় সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করে দেওয়ার পথে না হেঁটে, ধাপে ধাপে নিয়মের মধ্যে আনার পক্ষেই সওয়াল করলেন তিনি। বিজেপির প্রশিক্ষণ শিবির শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আস্তে আস্তে রেগুলারাইজ হয়ে যাবে।” একইসঙ্গে দমকলের ডিজিকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কেউ নিয়ম মানতে না চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু কড়া পদক্ষেপ নয়, বিষয়টি মানবিক এবং বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর যুক্তি, একটি হোটেল বা রেস্তোরাঁ শুধুমাত্র একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয় তার সঙ্গে যুক্ত থাকে বহু মানুষের রোজগার। ‘এই হোটেলেই প্রায় ২০০ জন ছেলে কাজ করে’ নিজের বক্তব্যের উদাহরণ দিতে গিয়ে যে হোটেলে বিজেপির প্রশিক্ষণ শিবির হয়েছিল, সেই হোটেলের কথাই তুলে ধরেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, এই হোটেলেই প্রায় ২০০ জন যুবক কাজ করেন। অর্থাৎ একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে শুধু মালিকের ব্যবসা বন্ধ হয় না, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কয়েকশো পরিবারের আয়-রোজগারও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, হোটেল-রেস্তোরাঁকে নিয়মের আওতায় আনতেই হবে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় সময় দিয়ে, বুঝিয়ে এবং নিয়ম মেনে চলার সুযোগ দিতে হবে। লাইসেন্স নিয়ে ‘হয়রানি-ঘুষ’ বন্ধের বার্তা দেন। শুধু ব্যবসায়ীদের নিয়ম মানার কথা বলেই থামেননি মুখ্যমন্ত্রী। লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক জটিলতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও কড়া অবস্থান জানান তিনি। শুভেন্দুর বক্তব্য, লাইসেন্সের আবেদন অনলাইনে করতে হবে এবং কোনও আবেদন অযথা পেন্ডিং রাখা যাবে না। লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ বা ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা চলবে না। একইসঙ্গে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও বন্ধ করতে হবে।
অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রীর বার্তার মূল সুর একদিকে যেমন হোটেল, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম মানতেই হবে, তেমনই অন্যদিকে লাইসেন্স দেওয়ার নামে প্রশাসনিক স্তরে অযথা হয়রানি বা দুর্নীতির অভিযোগও বরদাস্ত করা হবে না। ‘কেউ কথা না শুনলে ব্যবস্থা’ তবে নিয়ম মানার জন্য সময় দেওয়ার অর্থ যে ছাড় দেওয়া নয়, সেটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, আগে সংশ্লিষ্টদের বুঝিয়ে নিয়ম মানানোর চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনীয় সময় দেওয়ার পরেও কেউ যদি নির্দেশ অমান্য করেন, সেক্ষেত্রে দমকল কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে ৩৭এ-এর প্রসঙ্গও। তাঁর দাবি, দমকলের ডিজিকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং কেউ নিয়ম না মানলে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে। নিউ মার্কেটের দুর্ঘটনার পর কেন এত গুরুত্ব? হোটেল ও রেস্তোরাঁর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে এই কড়া বার্তার পিছনে সাম্প্রতিক একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। ওই ঘটনার পর প্রশাসনের তরফে হোটেলগুলিতে অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত অডিট ও পরিদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নিউ মার্কেট এলাকায় প্রশাসনের যৌথ অভিযানে একাধিক হোটেলকে বন্ধের নোটিসও দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বেশ কিছু হোটেলে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুমোদন ছিল না। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য কার্যত একটি ভারসাম্যের বার্তা নিয়ম ভাঙলে ব্যবস্থা হবে, কিন্তু নিয়মের মধ্যে আসার সুযোগও দিতে হবে। অন্যদিকে দমকল বিভাগের কাজের প্রশংসাও করেছেন শুভেন্দু অধিকারী।
রামপুরহাটের একটি অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, ঘটনাটি ঘটে ভোরে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভোর ৫টা ২০ মিনিটে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয় এবং মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই, ৫টা ২৩ মিনিটে দমকল ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। এরপর দমকল ও উদ্ধারকারী দলের তৎপরতায় ঘটনাস্থল থেকে ৩৪ জনকে উদ্ধার করা হয় বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী।
এই দ্রুততার প্রশংসা করে তিনি বলেন, বিপদের মুহূর্তে দমকলের কর্মীরা কীভাবে মানুষের জীবন বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন, এই ঘটনা তারই উদাহরণ। নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গেও দমকলের প্রশংসা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, ওই দুর্ঘটনায় উদ্ধারকারী দল বুড়ো সিঁড়ি ও রেডার ব্যবহার করে প্রায় ৮০ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছিল। অগ্নিকাণ্ডের মতো পরিস্থিতিতে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক মিনিটের দেরিও বহু মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে দিতে পারে। সেই জায়গায় দমকল কর্মীদের দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছনো এবং ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধারকাজ চালানোর বিষয়টিকেই সামনে আনেন মুখ্যমন্ত্রী।
দমকলের ক্ষমতা নিয়েও রাজনৈতিক আক্রমণ শানিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকার দমকলের ডিজির ‘হাত-পা বেঁধে’ রেখেছিল। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে দমকল কর্তৃপক্ষের হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা ছিল না বলে দাবি তাঁর। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান সরকার সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন করেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দমকল কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে নিউ মার্কেটের দুর্ঘটনার পর ৩৭এ প্রয়োগের অনুমতি দেওয়ার প্রসঙ্গও তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল হোটেল ও রেস্তোরাঁয় অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া। কারণ একটি হোটেল বা রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু ব্যবসা বন্ধ হয় না। রান্নাঘরের কর্মী, পরিবেশনকারী, নিরাপত্তারক্ষী, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কর্মী থেকে শুরু করে সরবরাহকারী বহু মানুষের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে একদিকে যেমন স্পষ্ট সতর্কবার্তা“নিয়ম মানতেই হবে”, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে প্রশাসনের প্রতি নির্দেশ “লাইসেন্স দেওয়ার নামে হয়রানি করা যাবে না, ঘুষ নেওয়া যাবে না এবং আবেদন অযথা পেন্ডিং রাখা যাবে না।” অর্থাৎ ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং নিরাপত্তার নিয়ম মেনে ব্যবসা চালানোর পরিবেশ তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য এমনটাই বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পর যখন হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলির অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, তখন শুভেন্দু অধিকারীর এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। এখন দেখার, ৩৭এ-এর ক্ষমতা প্রয়োগ, অনলাইন লাইসেন্সিং এবং দমকলের ছাড়পত্রের ক্ষেত্রে আগামী দিনে কতটা কঠোর পদক্ষেপ নেয় প্রশাসন।










