নয়াদিল্লি: বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে ভারতের অবস্থান আরও দৃঢ় হচ্ছে। দেশের কৌশলগত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে সামনে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টস (FAS)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডারে বর্তমানে আনুমানিক ১৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে।
মুক্ত তথ্যসূত্র, উপগ্রহ চিত্র, প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সরকারি নথি এবং বিভিন্ন কৌশলগত তথ্য বিশ্লেষণ করে এই অনুমান করা হয়েছে। ভারতের হাতে থাকা মোট পরমাণু ওয়ারহেডের একটি বড় অংশ বর্তমানে মোতায়েনযোগ্য বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও লঞ্চ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উপযোগী। পাশাপাশি ভবিষ্যতের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও নতুন প্রজন্মের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির জন্যও কিছু ওয়ারহেড সংরক্ষিত রাখা হয়েছে বলে অনুমান গবেষকদের।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারত তার পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও আধুনিক করার পথে এগিয়েছে। স্থলভিত্তিক ব্যালিস্টিক মিসাইলের পাশাপাশি সমুদ্র থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ক্ষমতা এবং পরমাণুচালিত ডুবোজাহাজের উন্নয়নেও জোর দেওয়া হয়েছে।
সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারতের কাছে যে পরিমাণ অস্ত্র-মানের প্লুটোনিয়াম রয়েছে, তা দিয়ে ভবিষ্যতে আরও বেশি সংখ্যক ওয়ারহেড তৈরির প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আগামী দিনে ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার আরও কিছুটা বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের দিক থেকেও এই তথ্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। গবেষণা সংস্থার অনুমান অনুযায়ী, পাকিস্তানের হাতে প্রায় ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। সেই হিসেবে সংখ্যার বিচারে পাকিস্তানের তুলনায় এগিয়ে ভারত।
তবে চীনের আনুমানিক ৬২০টি পরমাণু ওয়ারহেডের তুলনায় ভারতের অস্ত্রভাণ্ডার এখনও অনেকটাই ছোট। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে রয়েছে কয়েক হাজার পারমাণবিক অস্ত্র।
ভারতের কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল ‘নিউক্লিয়ার ট্রায়াড’। অর্থাৎ স্থল, আকাশ এবং সমুদ্র এই তিন ক্ষেত্র থেকেই প্রয়োজনে পারমাণবিক প্রত্যাঘাত চালানোর সক্ষমতা।
বিশেষ করে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং পরমাণুচালিত ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিনের আধুনিকীকরণ ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সক্ষমতা ভারতের ‘সেকেন্ড স্ট্রাইক’ বা পাল্টা পারমাণবিক আঘাত হানার ক্ষমতাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে।
পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডারে আধুনিকীকরণ চললেও ভারতের ঘোষিত নীতির মূল ভিত্তি এখনও ‘No First Use’ বা প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার না করার নীতি।
১৯৯৮ সালের পোখরান পরমাণু পরীক্ষার পর থেকেই ভারত জানিয়ে আসছে, কোনও দেশ আগে পারমাণবিক হামলা না চালালে ভারত নিজে থেকে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের পথে যাবে না।
একই সঙ্গে ভারতের পরমাণু নীতির মূল লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে ‘বিশ্বাসযোগ্য ন্যূনতম প্রতিরোধ’ বা Credible Minimum Deterrence। অর্থাৎ আগ্রাসনের বদলে সম্ভাব্য পারমাণবিক হুমকি মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ওয়ারহেডের সংখ্যা নয়, বরং দ্রুত প্রতিক্রিয়া, দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, শক্তিশালী সাবমেরিন বহর এবং তিন বাহিনীর সমন্বিত পারমাণবিক সক্ষমতার দিকেই এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ভারত। ফলে দক্ষিণ এশিয়া থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক বৃহত্তর কৌশলগত সমীকরণে ভারতের পরমাণু শক্তির এই আধুনিকীকরণ আগামী দিনেও বিশেষ নজরে থাকবে।











