নিজস্ব সংবাদদাতা, পশ্চিম মেদিনীপুর: ফের হাতি-মৃত্যুর ঘটনায় শোরগোল পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলে। এবার একসঙ্গে প্রাণ গেল তিনটি হাতির দু’টি শাবক এবং একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির। রবিবার সকালে পিড়াকাটা রেঞ্জের রঞ্জা বিটের হাড়তড়া এলাকার একটি ধানজমি থেকে তিনটি হাতির নিথর দেহ উদ্ধার ঘিরে ছড়িয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য।
সকালে মাঠে কাজে বেরিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের নজরে আসে মর্মান্তিক দৃশ্যটি। ধানজমির মধ্যে পাশাপাশি পড়ে রয়েছে তিনটি হাতি। মুহূর্তেই খবর ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। ঘটনাস্থলে ভিড় জমান বহু মানুষ। খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছন বনদপ্তরের কর্মীরাও। কিন্তু কীভাবে একই সঙ্গে তিনটি হাতির মৃত্যু হল? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে গোটা এলাকায়।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, হাতিগুলির মৃত্যু বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে থাকতে পারে। কারণ, যে জমিতে মৃতদেহগুলি পাওয়া গিয়েছে, তার উপর দিয়ে বিদ্যুতের তার নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। বনদপ্তর সূত্রেও জানা গিয়েছে, কৃষিকাজে পাম্প চালানোর প্রয়োজনে জমির উপর দিয়ে বিদ্যুতের সংযোগ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই তার থেকেই কোনওভাবে বিদ্যুৎ ছড়িয়ে পড়েছিল কি না, তা এখন তদন্তের অন্যতম বিষয়।
আর এখানেই প্রশ্ন উঠছে বিদ্যুৎ দপ্তরের ভূমিকা নিয়েও। ধানজমির উপর দিয়ে যে ভাবে বিদ্যুতের তার নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেই সংযোগ আদৌ নিয়ম মেনে ছিল কি? তারের উচ্চতা ও নিরাপত্তাবিধি ঠিক ছিল তো? কোনও জায়গায় তার ঝুলে পড়েছিল কি না, তা নিয়ে নিয়মিত নজরদারি হয়েছিল? সংযোগটি বৈধ না বেআইনি তা কি আগে কখনও পরীক্ষা করা হয়েছিল? হাতির বিচরণপ্রবণ এলাকায় বিদ্যুৎ দপ্তর এবং বনদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় কতটা রয়েছে, সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।
জঙ্গল সংলগ্ন এলাকায় হাতির যাতায়াত নতুন ঘটনা নয়। ফলে এমন এলাকায় খোলা, নিচু বা বিপজ্জনক বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলে তার পরিণতি যে ভয়াবহ হতে পারে, তা অতীতেও দেখা গিয়েছে। তারপরেও যদি বিপজ্জনকভাবে বিদ্যুতের তার টেনে কৃষিকাজ চালানো হয়ে থাকে, তবে সেই ব্যবস্থার উপর নজরদারি কার দায়িত্বে ছিল। এই প্রশ্নের উত্তরও চাইছেন স্থানীয়রা। তবে বনদপ্তর এখনও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। পিড়াকাটা রেঞ্জের এক বনকর্তা জানিয়েছেন, তিনটি হাতির ময়নাতদন্তের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে। ইতিমধ্যেই মৃত হাতিগুলি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
একসঙ্গে মা-হাতি ও দুই শাবকের মৃত্যুতে মন ভার স্থানীয়দের। সকাল থেকেই মৃত হাতিগুলিকে দেখতে ভিড় জমেছে ঘটনাস্থলে। কিন্তু শোকের পাশাপাশি বাড়ছে ক্ষোভ এবং প্রশ্নও মৃত্যুর কারণ যদি শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়াই প্রমাণিত হয়, তবে এই তিনটি প্রাণের দায় নেবে কে? শুধু তদন্তেই কি শেষ হবে ঘটনা, নাকি বিপজ্জনক বিদ্যুৎ সংযোগ চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে? এখন ময়নাতদন্তের রিপোর্টের দিকেই নজর সকলের। সেই রিপোর্টই স্পষ্ট করবে তিন হাতির মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পিছনে ছিল অবহেলার ভয়াবহ ফাঁদ।












