নিজস্ব সংবাদদাতা, ঘাটাল: বিদ্যাসাগরের জন্মভিটে বীরসিংহকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন ও গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাস্তা প্রশস্ত করা থেকে পর্যটকদের নৈশযাপনের ব্যবস্থা, মিউজিয়াম ও লাইব্রেরির সম্প্রসারণ বীরসিংহকে নতুন ভাবে সাজানোর একগুচ্ছ পরিকল্পনার কথা বুধবার জানালেন তিনি। একই মঞ্চ থেকে বন্যাবিধ্বস্ত ঘাটালের জন্যও বড় ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের জন্য চলতি অর্থবর্ষে ১,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানান তিনি।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মবার্ষিকী বাংলা তিথি অনুযায়ী পালনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এ দিন পশ্চিম মেদিনীপুরের বীরসিংহে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এর আগেও একাধিক বার বিদ্যাসাগরের জন্মভিটেতে এসেছেন, তবে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এই প্রথম। তাই এই সফর তাঁর কাছে ‘আনন্দ ও গর্বের’। প্রকাশিত প্রতিবেদনেও এটিই তাঁর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বীরসিংহ সফর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিদ্যাসাগরের বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মা ভগবতী দেবীর মূর্তি উন্মোচন করেন মুখ্যমন্ত্রী। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির আওতায় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে ওই মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। এ দিন একটি বৃক্ষরোপণও করেন তিনি। পাশাপাশি তিন তরুণীর সঙ্গে কথা বলেন, যাঁরা অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তাঁদের বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা নিজেরাই প্রতিহত করেছিলেন। তাঁদের উদাহরণ সামনে রেখে মুখ্যমন্ত্রী বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারের আদর্শের প্রসঙ্গ তোলেন।
বীরসিংহকে ঘিরে পর্যটনের নতুন পরিকল্পনাও ঘোষণা করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, শুধু বক্তৃতায় নয়, কাজের মাধ্যমে বিদ্যাসাগরের জন্মভিটেকে একটি আদর্শ গন্তব্যে পরিণত করতে চায় সরকার। রাস্তা চওড়া করা, পর্যটক ও গবেষকদের থাকার ব্যবস্থা, মিউজিয়াম ও লাইব্রেরির উন্নয়ন, আলোকসজ্জা-সহ একাধিক পরিকাঠামোগত কাজের পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যটন দফতরকে আবাসন ও গবেষকদের জন্য বিশেষ কটেজ তৈরির বিষয়েও পরিকল্পনা করতে বলা হয়েছে। পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে সৌরবাতি বসানো-সহ একাধিক প্রকল্পের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারের ভাবনাকে সামনে রেখে বাল্যবিবাহ, নারীশিক্ষা এবং নেশার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের একাধিক সূচকে রাজ্যকে আরও এগোতে হবে। বাল্যবিবাহ এবং নাবালিকাদের মাতৃত্বের মতো সামাজিক সমস্যা ঠেকাতে স্বাস্থ্য ও প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হওয়ার বার্তা দেন তিনি। পাশাপাশি নেশামুক্ত বাংলা গড়তে সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি এবং মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করার কথাও বলেন।
স্কুলের গ্রন্থাগারগুলিতে বিদ্যাসাগরের লেখা বই আরও বেশি করে রাখার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী। বিদ্যাসাগরের নারীশিক্ষা, বিধবা বিবাহ এবং সমাজ সংস্কারের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তাঁর বক্তব্য, নতুন প্রজন্মের কাছে বিদ্যাসাগরের সাহিত্য ও চিন্তাভাবনা আরও বেশি করে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। গ্রন্থাগারে বিদ্যাসাগরের রচনা সংগ্রহের উপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও এ দিনের অনুষ্ঠানে উঠে এসেছে। তবে এ দিনের অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বড় ঘোষণাগুলির একটি ছিল ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান। মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রকল্পের জন্য চলতি অর্থবর্ষে ১,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পের ব্যয়ের ৫০ শতাংশ কেন্দ্র এবং বাকি অংশ রাজ্য বহন করবে। বর্ষা শেষ হলে কাজের গতি বাড়িয়ে আগামী জুন পর্যন্ত দ্রুত কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশও দেন তিনি।
বীরসিংহে আসার পথে আকাশপথে ঘাটালের বন্যা পরিস্থিতিও পরিদর্শন করেন বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিতে ঘাটাল ও চন্দ্রকোনার বহু এলাকা জলমগ্ন হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তা, বাড়ি ও কৃষিজমি। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের সঙ্গে পরিকল্পনা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কাঁচা বাড়ির তালিকা তৈরির জন্য স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়ার কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর ঘোষণা, নির্দিষ্ট তালিকায় থাকা ক্ষতিগ্রস্ত কাঁচা বাড়ির জন্য ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। কৃষিজমির ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রেও ধান, পান ও সবজি চাষিদের জন্য শস্যবিমার সুবিধা দ্রুত পৌঁছে দিতে ক্যাম্প করার কথা জানান তিনি। কাঁচা বাড়ির জন্য ১.৮০ লক্ষ টাকা সহায়তার ঘোষণার বিষয়টিও অন্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ঘাটাল-পাঁশকুড়া রেলপথ নিয়েও এ দিন মুখ খোলেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তরের বিষয়টি দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান তিনি। রাজ্যের শিল্পায়নের প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তৃতায়। রিলায়েন্স গোষ্ঠীর তরফে রাজ্যে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই সংক্রান্ত কর্মসূচির কারণেই তাঁকে দ্রুত কলকাতায় ফিরতে হবে বলেও জানান তিনি। রিলায়েন্সের সম্ভাব্য বিনিয়োগের বিষয়টি এ দিনের অন্য সংবাদ প্রতিবেদনেও মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগামী দিনে অবিভক্ত মেদিনীপুরকে ঘিরেও উন্নয়নের একাধিক পরিকল্পনা রয়েছে। মেদিনীপুর শহরের কলেজ-কলেজিয়েট মাঠে এসে আরও উন্নয়নমূলক ঘোষণা করার কথাও বলেন তিনি। বিদ্যাসাগরের জন্মভিটে থেকে এ দিন তাই শুধুই স্মরণ নয় পর্যটন, শিক্ষা, সমাজ সংস্কার থেকে ঘাটালের বন্যা নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত একগুচ্ছ ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী। এখন নজর, ঘোষিত প্রকল্পগুলি বাস্তবে কত দ্রুত রূপ পায় এবং দীর্ঘদিনের বন্যা সমস্যায় ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান কতটা কার্যকর হয়ে ওঠে।











