নিজস্ব সংবাদদাতা, দাঁতন: নেই কামানের তোপ। নেই ঝাড়বাতির চোখধাঁধানো রোশনাই। জমিদারির সেই পুরনো জৌলুসও এখন ইতিহাস। কিন্তু সময়ের স্রোতেও মুছে যায়নি কয়েক শতকের বিশ্বাস ও পরম্পরা। সেই ঐতিহ্য মেনেই আজও নবমীর দিন বিশেষ ‘মহামারী পুজো’ হয় পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতনের আঙ্গুয়া দাস মহাপাত্র জমিদারবাড়িতে।
পরিবারের দাবি, প্রায় আড়াইশো বছরেরও বেশি আগে এই দুর্গাপুজোর সূচনা। সেই সময় বাংলার বিভিন্ন এলাকায় কলেরা, বসন্ত-সহ নানা সংক্রামক রোগের প্রকোপ ছিল প্রবল। রোগব্যাধির হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার প্রার্থনা জানিয়ে দেবী দুর্গার আরাধনার সঙ্গে শুরু হয় বিশেষ ‘মহামারী পুজো’। বিশ্বাস ছিল, দেবীর কৃপায় দূর হবে দুর্যোগ ও রোগের প্রকোপ। সময় বদলেছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানেরও উন্নতি হয়েছে, কিন্তু পুজোর সেই বিশেষ রীতি এখনও অটুট। এই বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাসেও রয়েছে একাধিক পর্ব। প্রথম দিকে প্রতিমা নয়, ঘট বসিয়েই পুজো হত। পরে শুরু হয় পটপুজো। তারও পরে আসে মৃন্ময়ী প্রতিমা। বর্তমানেও সেই প্রতিমার গড়নে রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। বৈষ্ণব আদলের প্রতিমাকে শাক্ত মতে আরাধনা করা হয় দাস মহাপাত্র পরিবারে।
পারিবারিক ইতিহাস অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতকে বর্গি আক্রমণের সময় ওড়িশার খুরদা এলাকা থেকে পরিবারের পূর্বপুরুষ বিরিঞ্চি মহান্তি নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে জলেশ্বর পরগনায় চলে আসেন। পরে দাঁতনের পলাশিয়ায় বসবাস শুরু করেন। জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব পেয়ে ধীরে ধীরে এলাকায় তাঁর প্রভাবও বাড়তে থাকে। পরবর্তীকালে পরিবারের হাত ধরেই শুরু হয় দুর্গোৎসব। প্রথমে ঘটপুজো চললেও রূপনারায়ণ দাস মহাপাত্রের সময়ে পটপুজোর প্রচলন হয় বলে পরিবারের দাবি। পরে চৌধুরী যাদবেন্দ্রনাথ দাস মহাপাত্রের উদ্যোগে শুরু হয় প্রতিমাপুজো।
পরিবারের পদবি বদলের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস। ‘মহান্তি’ থেকে ‘দাস মহাপাত্র’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে জমিদারি প্রশাসনের ভূমিকার কথা বলেন পরিবারের সদস্যরা। জমিদারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মচারীদের এক সময় ‘মহামাত্য’ বলা হত। সেই শব্দের পরিবর্তিত রূপ থেকেই ‘মহাপাত্র’ নামের প্রচলন হয়েছে বলে তাঁদের ধারণা। পাশাপাশি কায়স্থ পরিচয়ের সূত্রে ‘দাস’ পদবিও যুক্ত হয়। ব্রিটিশ আমলে পরিবারের সঙ্গে ‘চৌধুরী’ উপাধিও জুড়ে যায়।
দুর্গাপুজোর বিভিন্ন আচারেও আজও পুরনো দিনের ছাপ স্পষ্ট। প্রতিপদে পরিবারের ঐতিহ্যবাহী তরবারি নিয়ে ঘট তোলার মধ্য দিয়ে শুরু হয় পুজো। দেবীর চক্ষুদানের সময় চালকুমড়ো বলির রীতি রয়েছে। সপ্তমীতে সাতটি, অষ্টমীতে আটটি, নবমীতে ন’টি এবং দশমীতে একটি চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। নবমীর দিন বহু গ্রামবাসীও মানত করে চালকুমড়ো নিয়ে আসেন।
এই পুজোর আরও একটি বিশেষ আকর্ষণ খইয়ের মুড়কি। পুজোর প্রায় এক মাস আগে থেকেই পরিবারের গৃহবধূরা মুড়কি তৈরির কাজ শুরু করেন। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মুড়কি তৈরি হয়। প্রথা অনুযায়ী, এই মুড়কি পরিবারের সদস্যরা খান না। পুজো দেখতে আসা দর্শনার্থী ও গ্রামবাসীদের মধ্যেই তা বিলি করা হয়।
হোমের আগুন নিয়েও রয়েছে প্রাচীন রীতি। আগে আতসকাচের সাহায্যে সূর্যের আলো থেকে আগুন জ্বালানো হত। তা সম্ভব না হলে অগ্নিহোত্রী ব্রাহ্মণের বাড়ি থেকে আগুন আনার চল ছিল। এক সময় হোমে প্রায় এক মণ ঘি ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে সেই পরিমাণ অনেকটাই কমেছে। দেবীকে এই পরিবারে শুধুমাত্র শক্তির প্রতীক হিসেবে নয়, বাড়ির কন্যারূপেও বরণ করা হয়। মাতৃরূপে তাঁর আরাধনা চলে কয়েক দিন ধরে। দশমীতে আজও প্রথা মেনে আয়োজন করা হয় রাবণ বধের।
এক সময় এই পুজোকে কেন্দ্র করে মঙ্গলগান, চণ্ডীমঙ্গল ও যাত্রাপালার আসর বসত। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেলেও শিবায়ন গানের মতো কিছু পুরনো রীতি এখনও টিকে রয়েছে। দুর্গামণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো সিংহদুয়ার আজও অতীতের জমিদারি আমলের সাক্ষ্য বহন করছে। জমিদারি নেই, রাজকীয় ঠাটবাটও নেই, তবু পুজোর কয়েকটা দিন জমজমাট হয়ে ওঠে আঙ্গুয়া দাস মহাপাত্র বাড়ি।
পরিবারের সদস্যদের কথায়, পূর্বপুরুষেরা বিশ্বাস করতেন মহামারী ও নানা রোগব্যাধি থেকে মানুষের মুক্তির জন্য দেবীর বিশেষ আরাধনা প্রয়োজন। সেই বিশ্বাস থেকেই শুরু হয়েছিল মহামারী পুজো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই রীতিই আজও বহন করে চলেছে দাস মহাপাত্র পরিবার। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, হারিয়েছে জমিদারির জৌলুস। তবু আঙ্গুয়া দাস মহাপাত্র বাড়ির দুর্গাপুজোয় আজও বেঁচে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, বিশ্বাস আর মানুষের মঙ্গলকামনার সেই বিশেষ ‘মহামারী পুজো’।













