নিজস্ব সংবাদদাতা, সবং: দুর্গাপুজো মানেই নতুন জামা, নতুন সাজ আর অনাবিল আনন্দ। কিন্তু নিজের আনন্দের পাশাপাশি বন্ধুর মুখেও হাসি ফোটানোর যে আলাদা তৃপ্তি রয়েছে, তা যেন আরও এক বার প্রমাণ করল একদল খুদে পড়ুয়া। পুজোর আগে নিজেদের সহপাঠীদের হাতে নতুন পোশাক তুলে দিয়ে মানবিকতার এক সুন্দর দৃষ্টান্ত তৈরি করল পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং ব্লকের দশগ্রামের গিরিশচন্দ্র জুনিয়ার ব্যাসিক স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা। উৎসবের আনন্দ যে ভাগ করে নিলেই বেড়ে যায়, ছোটদের এই উদ্যোগ যেন সেই বার্তাই পৌঁছে দিল বড়দের কাছেও।
প্রতি বছরের মতো এ বছরও বিদ্যালয়ের ‘প্রণব সাধন নাট্যমঞ্চে’ আয়োজন করা হয়েছিল বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। নাচ, গান, আবৃত্তি ও নাটকের মধ্য দিয়ে দেবীর অসুরবধের কাহিনি ফুটিয়ে তোলে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। খুদে শিল্পীদের পরিবেশনায় উৎসবের আবহ তৈরি হয় গোটা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। তবে শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এ দিনের আয়োজন। বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের এক সুন্দর ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখে পুজোর আগে সহপাঠীদের হাতে নতুন পোশাক তুলে দেয় পড়ুয়ারা। স্কুলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ২৫ জন ছাত্রছাত্রী মিলে ৩২ জন বন্ধুর হাতে নতুন পোশাক উপহার দিয়েছে।
কেউ দিল এক জনকে, কেউ আবার দুই কিংবা তিন জন বন্ধুকে। উপহারের পরিমাণ নয়, বন্ধুর মুখে হাসি ফোটানোই ছিল আসল উদ্দেশ্য। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র অভীপ্স সামন্ত নতুন পোশাক তুলে দেয় বুসরা খাতুন ও কাশ্মীরা খাতুনের হাতে। চতুর্থ শ্রেণির বৃষ্টি পাউ উপহার দেয় তিন সহপাঠী নুসরত খাতুন, রিয়া সাঁতরা ও প্রশান্ত সরেনকে। শ্রীতমা দাস নতুন পোশাক দেয় আসমিন খাতুনকে। চতুর্থ শ্রেণির অস্মিতা কর পোশাক তুলে দেয় বিকাশ দাসের হাতে। অঙ্কন গুছাইত উপহার দেয় শিবশঙ্কর দাসকে।
পিছিয়ে থাকেনি বিদ্যালয়ের একেবারে ছোটরাও। প্রথম শ্রেণির প্রত্যুষ দাস নিজের সহপাঠী সায়ন হেমরমকে নতুন পোশাক উপহার দেয়। তৃতীয় শ্রেণির সমর্পণ রানা পোশাক তুলে দেয় রোহন হেমরমের হাতে। শিশু শ্রেণির বিনিতা দাস নিজের বন্ধু কিংকর ঘোড়ইকে উপহার দেয় পুজোর নতুন পোশাক। এ ভাবেই ছোট ছোট হাতের উপহারে অন্য মাত্রা পায় উৎসবের আয়োজন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক এবং দশগ্রাম মঙ্গল ভারতীর সদস্য-সদস্যারা। উপস্থিত ছিলেন যুগল প্রধান, গুরুবর ঘোড়ই, বিক্রমচন্দ্র দাস ও সুভাষচন্দ্র প্রধান-সহ বিশিষ্টজনেরা।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনুপম সাঁতরা জানান, প্রতি বছর পুজোর আগে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা নিজেরাই উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে। সেই আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বন্ধুদের নতুন পোশাক উপহার দেওয়ার রীতি। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য এ বারও বজায় রেখেছে পড়ুয়ারা। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কি শুধুই বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ? নাকি সেই শিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের আনন্দে শামিল হওয়া এবং ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতাও? দশগ্রামের এই উদ্যোগ যেন সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিল।
একদিকে মহিষাসুরমর্দিনীর পরিবেশনায় অশুভ শক্তির বিনাশের বার্তা, অন্য দিকে সহপাঠীদের হাতে নতুন পোশাক তুলে দিয়ে মানবিকতার প্রকাশ। দুইয়ের মেলবন্ধনে বিদ্যালয়ের পুজোর আগের অনুষ্ঠান হয়ে উঠল অন্য রকম। পুজোর নতুন জামার আনন্দ তো প্রতি বছরই আসে। কিন্তু নিজের হাতে বন্ধুকে নতুন জামা দেওয়ার যে আনন্দ, সেই স্মৃতি হয়তো থেকে যাবে অনেক দিন। দশগ্রামের খুদে পড়ুয়াদের এই উদ্যোগ মনে করিয়ে দিল উৎসবের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি নিজের আনন্দ নয়, অন্যের মুখে হাসি ফোটানো।











