নিজস্ব সংবাদদাতা, সবং: সময় বদলেছে। বদলেছে সমাজসেবার প্রচারের ধরনও। এখন সমাজসেবার ছবি মুহূর্তে পৌঁছে যায় সামাজিক মাধ্যমে। কোথাও সংবর্ধনা, কোথাও মঞ্চে বক্তৃতা, কোথাও আবার বড় বড় ব্যানারে সমাজসেবীর পরিচয়। কিন্তু যাঁরা একদিন কোনও প্রচারের মোহ ছাড়াই সমাজের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদের স্মৃতিরক্ষার দায়িত্ব নিচ্ছেন কারা? পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং ব্লকের দশগ্রামে এক স্বাধীনতা সংগ্রামীর আবক্ষ মূর্তির বর্তমান অবস্থা সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। তিনি শ্রদ্ধেয় শ্রী গোপাল চন্দ্র দাস অধিকারী। জন্ম ১৯০১ সালের ১ সেপ্টেম্বর। মৃত্যু ১৯৮৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর। স্বাধীনতা সংগ্রামী, শিক্ষাব্রতী ও সমাজসেবী হিসেবে পরিচিত এই মানুষটির জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল শিক্ষা বিস্তার। সমাজের উন্নতি এবং শিক্ষার প্রসারকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন দশগ্রামের এই কৃতী সন্তান।
অথচ আজ তাঁর স্মৃতিকে ঘিরেই উঠছে অবহেলার অভিযোগ! দশগ্রামের খাজুরী বাজার স্কুল স্ট্যান্ডের বিশ্রামাগারে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশে নির্মাণ করা হয়েছে একটি সুন্দর আবক্ষ মূর্তি। উদ্দেশ্য ছিল, আগামী প্রজন্মের কাছে এই মানুষটির অবদানকে স্মরণীয় করে রাখা। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে মূর্তির সামনে লাগানো বৈদ্যুতিক আলোর অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কখনও জ্বলছে, কখনও নিভছে সেই আলো। যেন দীপাবলির ঝলমলে আলোর খেলা! অথচ এটি কোনও উৎসবের আলোকসজ্জা নয়, একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা শিক্ষাব্রতীর স্মৃতিবিজড়িত স্থান। প্রশ্ন হল, এত দিনেও বিষয়টি কারও নজরে পড়ল না কেন? নাকি নজরে পড়লেও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি কেউ?
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সমাজসেবার প্রচারে কোনও খামতি নেই। সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক ছবি, অনুষ্ঠানে উপস্থিতির বিবরণ, সংবর্ধনার মুহূর্ত সবই ফলাও করে তুলে ধরা হয়। কিন্তু সমাজসেবা কি শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার নাম? নাকি প্রচারের আড়ালেও সমাজের প্রতি কিছু দায়বদ্ধতা থেকে যায়? যাঁরা আজ নিজেদের সমাজসেবী বলে পরিচয় দেন, তাঁদের কাছে এই প্রশ্ন অস্বস্তিকর হলেও অপ্রাসঙ্গিক নয়। একজন প্রকৃত সমাজসেবীকে সম্মান জানাতে কি বড় অনুষ্ঠানের প্রয়োজন? একটি আবক্ষ মূর্তির সামনে থাকা আলো সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়াও কি সমাজসেবার পরিচয় হতে পারে না? আরও বড় প্রশ্ন, যিনি শিক্ষা বিস্তারকে জীবনের লক্ষ্য করেছিলেন, তাঁর আদর্শ ও অবদানের কথা বর্তমান প্রজন্মের কাছে কতটা তুলে ধরা হচ্ছে? শুধু একটি মূর্তি নির্মাণ করলেই কি স্মৃতিরক্ষার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবদান কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। তাঁদের আত্মত্যাগ, আদর্শ এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও বর্তমান সমাজের। সেই কারণেই দশগ্রামের এই দৃশ্য নিছক একটি বৈদ্যুতিক বাতির সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একজন বিশিষ্ট মানুষের স্মৃতির প্রতি সম্মান এবং সমাজের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। এখন দেখার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিংবা এলাকার সমাজসেবী সংগঠনগুলির কেউ বিষয়টির সমাধানে এগিয়ে আসেন কি না।
Sabang Bulletin-এর পক্ষ থেকে প্রশ্ন যাঁরা সমাজসেবার প্রচারে এত সক্রিয়, তাঁরা কি এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর স্মৃতিরক্ষায় একই ভাবে এগিয়ে আসবেন? নাকি সামাজিক মাধ্যমের ঝলমলে প্রচারের আড়ালে অবহেলিতই থেকে যাবেন গোপাল চন্দ্র দাস অধিকারী? কারণ, সমাজসেবা শুধু নিজের নাম আলোকিত করার বিষয় নয়, যাঁরা সমাজকে আলোকিত করে গিয়েছেন, তাঁদের স্মৃতিকেও সম্মানের সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব। স্বাধীনতা সংগ্রামীর আবক্ষ মূর্তির সামনে আলো জ্বলে-নেভে, কিন্তু সমাজের বিবেক কি জাগবে?













