ইন্দ্রজিৎ সাহু, সবং: সিভিক ভলান্টিয়ারদের নিয়ে বিতর্কের খবর মাঝেমধ্যেই শিরোনামে আসে। অভিযোগ, সমালোচনা, প্রশ্ন সবই থাকে আলোচনায়। কিন্তু সেই একই সিভিক কর্মীদের মানবিক মুখ, বিপদের মুহূর্তে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প অনেক সময়ই থেকে যায় আড়ালে। সোমবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রথম দিন পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ে দেখা গেল তেমনই এক উজ্জ্বল ছবি।
বাবা হঠাৎ অসুস্থ। সামনে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। পরীক্ষাকেন্দ্রও প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। এক মুহূর্তের জন্য যেন থমকে গিয়েছিল উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী রিয়া সিংয়ের সব পরিকল্পনা। ঠিক সেই কঠিন সময়েই তার পাশে দাঁড়ালেন এলাকার সিভিক কর্মীরা। আর তাঁদের তৎপরতাতেই শেষ পর্যন্ত সময়মতো পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে পরীক্ষা দিতে পারল রিয়া।
ঘটনাটি সবং ব্লকের দাঁদরা অঞ্চলের চাঁদকুড়ি এলাকার। চাঁদকুড়ি হাইস্কুলের ছাত্রী রিয়া সিং সোমবার সকালে বাড়িতে ঠাকুর প্রণাম ও বাবা-মাকে প্রণাম করে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে বেরোয়। বাবা মদন সিং মোটরবাইকে মেয়েকে নিয়ে বসন্তপুর হাইস্কুলের পরীক্ষাকেন্দ্রের দিকে রওনা দিয়েছিলেন।
কিন্তু চাঁদকুড়ি বাজার এলাকায় পৌঁছতেই আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়েন মদন সিং। মুহূর্তে বদলে যায় পরিস্থিতি। একদিকে বাবার শারীরিক অবস্থার চিন্তা, অন্যদিকে ঘড়ির কাঁটা দ্রুত এগিয়ে চলেছে পরীক্ষার সময়ের দিকে। কীভাবে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছবে, সেই দুশ্চিন্তায় কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে রিয়া।
ঠিক তখনই এগিয়ে আসেন দাঁদরা অঞ্চলের সিভিক কর্মীরা। প্রথমে অসুস্থ মদন সিংকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। তারপর তাঁদের নজর যায় উদ্বিগ্ন পরীক্ষার্থীর দিকে। সিদ্ধান্ত নিতে এক মুহূর্তও দেরি করেননি তাঁরা।
কালিপদ দে নামে এক সিভিক কর্মী নিজের মোটরবাইকে রিয়াকে বসিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের বসন্তপুর হাইস্কুলের পরীক্ষাকেন্দ্রের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। শেষ পর্যন্ত সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছতে পারে রিয়া এবং উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথম দিনের পরীক্ষায় বসে।
একদিকে বাবার অসুস্থতার উদ্বেগ, অন্যদিকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দুইয়ের মাঝে সিভিক কর্মীদের এই মানবিক উদ্যোগ রিয়ার কাছে হয়ে ওঠে বড় ভরসা। ঘটনার কথা জানাজানি হতেই স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে শোনা যায় প্রশংসা। অনেকেই বলছেন, “খারাপ খবর যেমন সামনে আসে, তেমনই ভালো কাজের কথাও মানুষের জানা উচিত।”
এ বিষয়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা বলেন, “আমরা তো পাবলিক সার্ভেন্ট। মানুষকে সেবা করাই আমাদের কাজ। সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়েও একজন মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো দরকার।”
সবংয়ের এই ঘটনা যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিল কর্তব্য শুধু নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন নয়, কখনও কখনও বিপদের সময়ে এক মানুষের পাশে আরেক মানুষের দাঁড়িয়ে যাওয়ার নামও কর্তব্য। আর সেই জায়গাতেই সোমবার চাঁদকুড়িতে মানবিকতার পরীক্ষায় উতরে গেলেন সিভিক কর্মীরা।











