নিজস্ব সংবাদদাতা, কেশিয়াড়ি: নিজের পড়াশোনা খুব বেশি দূর এগোয়নি। সংসারের টানাপড়েন আর মায়ের অসুস্থতার কারণে নবম শ্রেণির পরই থেমে গিয়েছিল স্কুলের পথ। কিন্তু সেখানেই থামেননি কাত্যায়নী পণ্ডা। নিজের অপূর্ণ শিক্ষাজীবনকেই যেন অন্যদের শেখানোর ব্রতে বদলে ফেলেছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়ির অলিনগরের এই প্রবীণা।
বয়স এখন প্রায় ৭২। সাধারণ শাড়ি, মোটা ফ্রেমের চশমা আর শান্ত স্বভাব তাঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই, প্রায় ৬০ বছর ধরে এলাকার অসংখ্য শিশুর শিক্ষার প্রথম ধাপ তৈরি করে চলেছেন তিনি।
শিক্ষকতার শুরু হয়েছিল একেবারে ছোট বয়সে। তখন কাত্যায়নী নিজেই পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। তার উপর অসুস্থ ছিলেন মা। সেই সময় এক শিশুকে পড়ানোর দায়িত্ব নেন তিনি। প্রয়োজন থেকে শুরু হলেও ধীরে ধীরে পড়ানোই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ছয় ভাইবোনের মধ্যে বড় হওয়ায় সংসারের দায়িত্বও অল্প বয়সেই এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। টিউশনি করে উপার্জিত অর্থে ভাইবোনদের পড়াশোনা ও বড় হয়ে ওঠার পথে সাহায্য করেছেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের সন্তানদেরও আগলে রেখেছেন একই ভাবে। নিজের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে পরিবার ও এলাকার শিশুদের ভবিষ্যৎকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন কাত্যায়নী।
অলিনগরে গাছপালায় ঘেরা ছোট্ট বাড়িটিই এখন তাঁর পাঠশালা। সপ্তাহের ছ’দিন সকাল ও বিকেলে সেখানে বসে ছোটদের পড়ার আসর। কেউ প্রথম অক্ষর চিনছে, কেউ নামতা শিখছে, আবার কেউ ইংরেজির প্রাথমিক পাঠ নিচ্ছে। খুব ছোট বয়স থেকেই পড়াশোনার ভিত শক্ত করা দরকার এই বিশ্বাস নিয়েই এখনও নিয়মিত পড়িয়ে চলেছেন তিনি।
বিনিময়ে মেলে সামান্য দক্ষিণা। তাতেই সাদামাটা ভাবে চলে তাঁর জীবন। অর্থ নয়, পড়ুয়ার সাফল্যই তাঁর কাছে বড় প্রাপ্তি। তাঁর কাছে হাতেখড়ি নেওয়া বহু ছাত্রছাত্রী আজ চিকিৎসা, শিক্ষা, নার্সিং-সহ নানা পেশায় প্রতিষ্ঠিত। অনেকেই আজও তাঁকে দেখলে পুরনো দিনের সেই ‘দিদি’ বলেই সম্মান জানান। সময় বদলেছে, পড়ানোর পদ্ধতি বদলেছে, বদলেছে প্রজন্মও। কিন্তু কাত্যায়নীর নিয়মে বদল আসেনি। প্রায় ছয় দশক ধরে একই নিষ্ঠায় শিশুদের হাতে বই তুলে দিচ্ছেন তিনি।
দুর্গাপুজোর আবহে চারদিকে যখন শক্তির আরাধনা, তখন কেশিয়াড়ির এই প্রবীণ শিক্ষিকার জীবনও যেন নিঃশব্দে অন্য এক শক্তির কথা বলে। নিজের স্বপ্ন অসম্পূর্ণ রেখেও অন্যের ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়ার যে সাধনা, অলিনগরের কাত্যায়নী পণ্ডা তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।











