ঝাড়গ্রাম: বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। কানে ভালোভাবে শুনতে পান না। নিজের হাতে রান্নাও করেন না। এই অবস্থায় ভিনরাজ্য হরিয়ানার গুরগাঁও থেকে মাকে নিয়ে ঝাড়গ্রামে এলেন ছেলে দেবজিত্ মুখোপাধ্যায়। তারপরই মাকে একা ফ্ল্যাটে রেখে বেপাত্তা! কোথায় গেলেন ছেলে, কবে ফিরবেন জানেন না কেউ। যাওয়ার আগে আবাসনের কাউকেও নাকি কিছু জানাননি। আর সেই থেকে চার দেওয়ালের মধ্যে কার্যত বন্দি জীবন কাটছে ৮৫ বছরের বৃদ্ধা কুমকুম মুখোপাধ্যায়ের।
অভিযোগ, যাওয়ার সময় মায়ের হাতে দিয়ে গিয়েছেন মাত্র ৪০০ টাকা। আর রাতে এক প্যাকেট দুধ পৌঁছে দেওয়ার জন্য আবাসনের কেয়ারটেকারকে বলে গিয়েছেন। সেই নির্দেশ মতোই রাতে বৃদ্ধার কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে দুধ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে ৮৫ বছরের এক বৃদ্ধার সারাদিনের খাবার, ওষুধ, নিরাপত্তা এবং দেখভালের দায়িত্ব কি এক প্যাকেট দুধ আর ৪০০ টাকায় শেষ হয়ে যায়? বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আবাসনের কেয়ারটেকারের সঙ্গে কথা বলে সংবাদমাধ্যম। তাঁর কাছ থেকে জানা যায়, বৃদ্ধা কানে শুনতে পান না এবং নিজে রান্নাও করেন না। ফলে ছেলে চলে যাওয়ার পর তাঁর দৈনন্দিন জীবন কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
ঘটনার কথা জানতে পেরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আবাসনের সেক্রেটারি তথা পেশায় শিক্ষক তপন মাহালি। তাঁর দাবি, প্রথমে তাঁরা বিষয়টি জানতেন না। কেয়ারটেকারের কাছ থেকে জানতে পেরেই বিষয়টি তাঁদের নজরে আসে। এরপর থেকেই বৃদ্ধাকে নিয়ে তাঁরা চিন্তিত। ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি গোটা বিষয়টি প্রশাসনের নজরেও আনা হবে বলে জানিয়েছেন আবাসন কর্তৃপক্ষ।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। মাকে নিয়ে এলেন কেন?একা রেখে গেলেন কেন? কোথায় গেলেন ছেলে? কেন কাউকে কিছু জানালেন না? বৃদ্ধার কোনও বিপদ হলে দায় নেবে কে? ঘটনাটি সামনে আসতেই স্থানীয়দের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যে মায়ের সন্তানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই মাকেই যদি সন্তান এভাবে একা ফেলে চলে যান, তাহলে এর চেয়ে বড় অসহায়তা আর কী হতে পারে?
এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গলমহলের বিভিন্ন পারিবারিক ঘটনাকে ঘিরে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই ঘটনাতেও ভিনরাজ্য থেকে এসে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনও পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন। তবে এমন কোনও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ষড়যন্ত্রের প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। তাই প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এই মুহূর্তে অবশ্য রাজনীতি বা বিতর্কের থেকেও বড় হয়ে উঠেছে একজন ৮৫ বছরের অসহায় মায়ের নিরাপত্তার প্রশ্ন। ছেলে কোথায়, জানেন না কেউ। মা রয়েছেন একা। দরজার দিকে তাকিয়ে হয়তো এখনও অপেক্ষা ‘কখন ফিরবে আমার ছেলে?’ মানবিকতার কাঠগড়ায় এখন সেই প্রশ্নই সবচেয়ে জোরালো।











