ইন্দ্রজিৎ সাহু: ছোট্ট গ্রাম থেকে উঠে আসা। জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে পাশে থেকেছেন মা। সাহস জুগিয়েছেন, আগলে রেখেছেন। সেই মায়ের স্বপ্ন পূরণ করে আজ তিনি জেলার পুলিশ সুপার। শুক্রবার মাকে পাশে নিয়েই জীবনের এক বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী থাকলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা। কেশিয়াড়ি থানার উদ্যোগে আয়োজিত রক্তদান শিবিরে মায়ের উপস্থিতিতেই রক্তদান করলেন তিনি। সেই সঙ্গে শোনালেন নিজের জীবনের লড়াই আর সাফল্যের নেপথ্যে থাকা মায়ের অবদানের কথা।
শুক্রবার পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কেশিয়াড়ি থানার উদ্যোগে আয়োজন করা হয় স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবিরের। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা, খড়্গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পার্থ ঘোষ, এসডিপিও আনন্দ মণ্ডল, কেশিয়াড়ি থানার আইসি সৌম্য চট্টোপাধ্যায়-সহ একাধিক পুলিশ আধিকারিক। তবে এ দিনের অনুষ্ঠানে সকলের নজর কাড়ে এক অন্য ছবি। রক্তদানের জন্য এগিয়ে আসেন খোদ জেলা পুলিশ সুপার। আর সেই সময় তাঁর পাশে উপস্থিত ছিলেন মা। পুলিশ সুপার হওয়ার পর প্রথম রক্তদান। তাও আবার মায়ের সামনে। স্বাভাবিক ভাবেই এই মুহূর্ত তাঁর কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
রক্তদানের পর নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে আবেগঘন হয়ে পড়েন পাপিয়া। তিনি বলেন, ‘‘আমি একটা গ্রাম থেকে বড় হয়েছি। মায়ের দেখানো স্বপ্ন সফল করতে পেরেছি। পুলিশ সুপার হওয়ার পর প্রথম রক্ত দিতে পেরে খুব ভাল লাগছে। আর আজ আমার সঙ্গে মা রয়েছেন, এটা আমার কাছে আরও বড় প্রাপ্তি।’’ এরপরেই মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘মা সব সময় আমার শক্তি হয়ে, ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। যখন কেঁদেছি, রাগ করেছি, তখনও মা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মা আমাকে সাহস জুগিয়েছেন।’’ জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার গুরুদায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি এ দিন রক্তদানের মাধ্যমে সামাজিক দায়বদ্ধতার বার্তাও দেন পুলিশ সুপার। তাঁর কথায়, সামনে উৎসবের মরসুম। এই সময় দুর্ঘটনা-সহ নানা জরুরি পরিস্থিতিতে রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। রক্তের অভাবে যাতে চিকিৎসা পরিষেবা ব্যাহত না হয়, সে জন্য স্বেচ্ছায় রক্তদানের গুরুত্ব অপরিসীম।
পুলিশ সুপার জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সেবামূলক কর্মসূচির অংশ হিসাবে কেশিয়াড়িতে এই রক্তদান শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। এই উদ্যোগের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদও জানান তিনি। শুধু রক্তদানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি কেশিয়াড়ি থানার এই কর্মসূচি। সমাজকল্যাণমূলক একাধিক উদ্যোগও নেওয়া হয়। দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠা ও দক্ষতার স্বীকৃতি হিসাবে সিভিক ভলান্টিয়ারদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয় জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে। পাশাপাশি, পুজোর আগে সমাজের পিছিয়ে পড়া ও অসহায় শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতেও বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
পুলিশের কাজ যে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়, মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোও যে তাদের অন্যতম দায়িত্ব, সেই বার্তাই উঠে আসে এ দিনের কর্মসূচিতে। তবে সব কিছুর মধ্যেও আলাদা করে নজর কাড়ল মা-মেয়ের আবেগঘন মুহূর্ত। এক দিকে জেলার পুলিশ সুপার হিসাবে দায়িত্ব, অন্য দিকে মায়ের কাছে আজও সেই ছোট্ট মেয়ে। মায়ের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া পাপিয়া সুলতানার কাছে শুক্রবারের রক্তদান শিবির তাই নিছক একটি সামাজিক কর্মসূচি নয়, হয়ে রইল জীবনের এক বিশেষ স্মৃতি।











