ইন্দ্রজিৎ সাহু, সবং: জমিদারি নেই। নেই সেই পুরনো আভিজাত্যও। কালের নিয়মে হারিয়ে গিয়েছে ঝাড়বাতি, অন্দরমহলের বহু সাজসজ্জা। তবু এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে পূর্বপুরুষের আমলের মাটির বাড়ি। আর সেই বাড়িতেই প্রায় তিনশো বছর ধরে শরৎ এলেই বাজে ঢাক। বংশপরম্পরায় দুর্গার আরাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন সবংয়ের বুড়াল অঞ্চলের গুন্ডুত গ্রামের মহাপাত্র পরিবারের সদস্যেরা।
পরিবারের প্রবীণদের মুখে মুখে আজও ফেরে এই পুজোর শুরুর এক অলৌকিক কাহিনি। তাঁদের কথায়, ১১৩৩ বঙ্গাব্দে পুজোর সূচনা করেছিলেন তৎকালীন জমিদার রামকান্ত মহাপাত্র। সেই সময় সবং এলাকার বড় ব্যবসায়ী হিসাবেও তাঁর যথেষ্ট পরিচিতি ছিল। ব্যবসার প্রয়োজনে নিয়মিত কলকাতা যাতায়াত করতেন রামকান্ত। কেলেঘাই নদীপথে মালপত্র আনা-নেওয়ার জন্য তাঁর ছিল দু’টি নৌকা ‘জয়’ ও ‘বিজয়’। সেই দুই নৌকার সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে মহাপাত্র পরিবারের পুজোর ইতিহাস। জনশ্রুতি, এক দিন কলকাতা থেকে ব্যবসার মালপত্র নিয়ে কেলেঘাই নদীপথে বাড়ি ফিরছিলেন রামকান্ত। নৌকাতেই তিনি স্বপ্নাদেশ পান। মা কালী নাকি তাঁকে জানান, তিনি রামকান্তের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে যাচ্ছেন। তবে শর্ত একটাই পিছন ফিরে তাকানো যাবে না।
কথিত আছে, ‘জয়’ ও ‘বিজয়’ নৌকার সঙ্গে মা কালীও এসেছিলেন। নৌকা থেকে নেমে বাড়ির পথে হাঁটার সময় পিছন থেকে নূপুরের শব্দ কানে আসে রামকান্তের। কৌতূহল সামলাতে না পেরে পিছন ফিরে তাকান তিনি। পরিবারের দাবি, তখনই দেবীর দর্শন পান রামকান্ত।
লোককথা অনুযায়ী, দেবী তখন তাঁকে জানান, আর মহাপাত্র বাড়ি পর্যন্ত যাবেন না। কেড়ুর গ্রামেই থেকে যাবেন। সেই থেকেই কেড়ুর গ্রামের জাগ্রত কালীমন্দিরে মা কালী পূজিত হয়ে আসছেন বলে বিশ্বাস স্থানীয়দের। তবে কাহিনি সেখানেই শেষ হয়নি। পরে ফের স্বপ্নাদেশ পান রামকান্ত মহাপাত্র। এ বার নির্দেশ আসে নিজের বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করার। সেই স্বপ্নাদেশ মেনেই মহাপাত্র বাড়িতে শুরু হয় দুর্গার আরাধনা।
তার পর কেটে গিয়েছে প্রায় তিন শতাব্দী। ব্রিটিশ আমল পেরিয়েছে, বদলেছে সময়, বদলেছে প্রজন্ম। কিন্তু পুজোর ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েনি। ষষ্ঠী থেকে দশমী পুজোর ক’টা দিন মহাপাত্র বাড়ি যেন হয়ে ওঠে মিলনমেলা। কর্মসূত্রে বাইরে থাকা পরিবারের সদস্যেরা ফিরে আসেন পূর্বপুরুষের ভিটেয়। আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি আশপাশের গ্রামের মানুষও ভিড় করেন পুজোয়। কয়েক দিনের জন্য আবার প্রাণ ফিরে পায় পুরনো বাড়ি।
পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সামাজিক রীতিও। পূর্বপুরুষদের আমল থেকে চলে আসা নিয়ম মেনে ষষ্ঠীর দিন দুঃস্থ মানুষদের বস্ত্র বিতরণ করা হয় পরিবারের পক্ষ থেকে। বিজয়া দশমীর দিন গোটা গ্রামের জন্য আয়োজন করা হয় খিচুড়ি প্রসাদের।
একসময় জমিদারির জৌলুস ছিল মহাপাত্র বাড়িতে। ঝাড়বাতির আলোয় ঝলমল করত অন্দরমহল। সময়ের সঙ্গে তার অনেকটাই আজ স্মৃতি। তবে এখনও টিকে রয়েছে সেই মাটির বাড়ি। বয়সের ভার নিয়েও যেন তিনশো বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।
‘জয়’ ও ‘বিজয়’ নৌকা নেই। নেই জমিদারির সেই প্রতাপও। তবু রয়ে গিয়েছে বিশ্বাস, রীতি আর পূর্বপুরুষের স্মৃতি। আর সেই ঐতিহ্যই আজও আগলে রেখেছেন মহাপাত্র পরিবারের উত্তরসূরিরা।তাই গুন্ডুতের এই দুর্গাপুজো শুধু চার দিনের উৎসব নয়। এ এক পরিবারের ইতিহাস, নদীপথের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি এবং প্রায় তিনশো বছরের বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প।













