ঝাড়গ্রাম: কখনও জেসিবি দিয়ে তৈরি হচ্ছে মাটির বাঁধ, কখনও স্রোতের মুখে ফেলা হচ্ছে বড় গাছের গুঁড়ি। প্রবল জলধারার সঙ্গে লড়াই করে একটানা প্রায় ২৯ ঘণ্টা চলল তল্লাশি। শেষ পর্যন্ত ঘাঘরা জলপ্রপাত এলাকা থেকে উদ্ধার হল নিখোঁজ পর্যটক প্রীতি দত্তের দেহ।
বারুইপুর থেকে পরিবারের সঙ্গে ঝাড়গ্রাম বেড়াতে এসেছিলেন প্রীতি। সেই আনন্দভ্রমণই আচমকা বদলে যায় বিপর্যয়ে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, জলপ্রপাতের কাছে ছবি তোলার সময় তাঁর ছেলে পা পিছলে জলে পড়ে যায়। সন্তানকে স্রোতে পড়তে দেখে তাকে বাঁচাতে কোনও দ্বিধা না করেই জলে নামেন প্রীতি।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই। স্ত্রী এবং সন্তানকে বিপদের মধ্যে দেখে প্রীতির স্বামী রাজদীপ দত্তও জলে ঝাঁপ দেন। স্থানীয়দের সাহায্যে রাজদীপ ও তাঁদের ছেলেকে নিরাপদে তুলে আনা সম্ভব হলেও প্রীতি প্রবল স্রোতের মধ্যে হারিয়ে যান।
তার পর থেকেই শুরু হয় বড়সড় উদ্ধার অভিযান। ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ, দমকল এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। বিশেষ ডুবুরি দলকেও নামানো হয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি করে নদীর প্রবল গতি এবং জলের নীচে থাকা বড় পাথরের চাঁই। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, স্পিডবোট নামিয়েও তল্লাশি চালানো সম্ভব হচ্ছিল না।
রাত নামার পরও অভিযান পুরোপুরি থামেনি। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আলো জ্বালিয়ে এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরের দিন সকালে নতুন পরিকল্পনায় শুরু হয় তল্লাশি। জলস্রোতের তীব্রতা কমাতে জেসিবির সাহায্যে অস্থায়ী মাটির বাঁধ তৈরি করা হয়। পাশাপাশি জলে গাছের গুঁড়ি ফেলে প্রবাহের গতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলে। সেই কৌশলেই শেষ পর্যন্ত তল্লাশি এগোয় এবং প্রায় ২৯ ঘণ্টা পর প্রীতির দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
তারাফেনী নদীর উপর ঘাঘরা জলপ্রপাত বর্ষার সময়ে অনেকটাই বদলে যায়। অন্য সময় তুলনায় শান্ত থাকলেও অতিরিক্ত জলে স্রোত বেড়ে গেলে পাথুরে অংশগুলি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই কারণেই পর্যটকদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে সাধারণত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা রাখা হয়।
তবে এই দুর্ঘটনার পর সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ঘটনার দিন বিপজ্জনক অংশে পর্যাপ্ত ব্যারিকেড ছিল না এবং নজরদারিও যথেষ্ট ছিল না। তাঁদের দাবি, অনেক পর্যটক তখন পাথুরে খাঁজের কাছে গিয়ে ছবি তুলছিলেন।
অন্যদিকে, প্রশাসনিক নজরদারির পাশাপাশি পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণের বিষয়টিও সামনে আসছে। বর্ষায় ফুলে ওঠা জলধারা, পিচ্ছিল পাথর এবং গভীর স্রোতের কাছাকাছি গিয়ে ছবি তোলা যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, ঘাঘরার এই ঘটনা আবারও সেই সতর্কতাই সামনে আনল।
একটি মুহূর্তে সন্তানকে বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন প্রীতি। ছেলে ফিরে এসেছে পরিবারের কাছে, কিন্তু ফিরলেন না মা। ঘাঘরায় ২৯ ঘণ্টার সেই দীর্ঘ তল্লাশি শেষ হলেও শোকের অপেক্ষা শেষ হল না দত্ত পরিবারের।











