নিজস্ব সংবাদদাতা, শালবনি: জঙ্গল লাগোয়া কৃষিজমিতে সেচের জন্য টানা বিদ্যুতের তারই শেষ পর্যন্ত কাল হল দুই শাবক-সহ তিনটি হাতির! শালবনির হাড়তোড়া গ্রামে তিন হাতির মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্তের রিপোর্ট সামনে আসতেই রহস্যের জট খুলল। রিপোর্টে স্পষ্ট, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েই মৃত্যু হয়েছে তিনটি হাতির। আর সেই রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরেই এক কৃষককে গ্রেফতার করল পুলিশ। ধৃতের নাম শ্যামল মাহাতো। তিনি শালবনি ব্লকের রঞ্জা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনের একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। সোমবার তাঁকে মেদিনীপুর আদালতে তোলা হয়।
ঘটনাটি ঘটেছে পিড়াকাটা রেঞ্জের হাড়তোড়া গ্রামে। কয়েক দিন আগে সেখান থেকে দুই হস্তিশাবক এবং একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির মৃতদেহ উদ্ধার হয়। ঘটনাস্থলের ছবি ঘিরেই প্রথম থেকে তৈরি হয়েছিল একাধিক প্রশ্ন। কারণ, তিনটি হাতির দেহের সঙ্গেই জড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায় বিদ্যুতের তার। তখনই জোরালো হয়েছিল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কা।খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় বনদপ্তর। তিনটি হাতির দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয়। অবশেষে সেই রিপোর্টেই নিশ্চিত হয় মৃত্যুর কারণ। বনদপ্তর সূত্রে দাবি, তিনটি হাতিই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গিয়েছে।
এর পরেই তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। বনদপ্তর ও পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, কৃষিজমিতে সেচের কাজে ব্যবহারের জন্য মূল বিদ্যুতের খুঁটি থেকে জমির দিকে তার টানা হয়েছিল। অভিযোগ, বাঁশ ও বল্লির অস্থায়ী খুঁটির সাহায্যে সেই তার নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মাঠের ভিতর দিয়ে। তারের উচ্চতাও ছিল যথেষ্ট কম। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, হাতির দল ওই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় নিচু হয়ে থাকা তারের সংস্পর্শে আসে। একটি হাতির শরীরে তার জড়িয়ে যাওয়ার পর টানাটানিতে সেটি ছিঁড়ে পড়ে। বিদ্যুৎ সংযোগ চালু থাকায় মুহূর্তের মধ্যেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় তিনটি হাতি। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাদের।
তদন্তে আরও জানা যায়, যে মিটার থেকে ওই জমির দিকে বিদ্যুৎ নেওয়া হয়েছিল, সেটি শ্যামল মাহাতোর নামে। সেই সূত্র ধরেই তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে আসার পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয় বলে বনদপ্তর ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। পিড়াকাটা রেঞ্জের বনদপ্তরের আধিকারিক শুভাশিস চৌধুরী জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তে তিনটি হাতির মৃত্যুর কারণ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া নিশ্চিত হয়েছে। ঘটনায় আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হচ্ছে।
তিনটি হাতির মৃত্যু এখন শুধু একটি দুর্ঘটনার তদন্তে আটকে নেই। প্রশ্ন উঠছে, জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় কৃষিজমিতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কতটা মানা হচ্ছে নিরাপত্তা বিধি? বাঁশ কিংবা বল্লির অস্থায়ী খুঁটিতে ঝুলে থাকা বিদ্যুতের তার যদি হাতির চলাচলের পথেই নেমে আসে, তবে বিপদ যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, হাড়তোড়ার ঘটনা তারই মর্মান্তিক নজির। একটি অসুরক্ষিত বিদ্যুৎ সংযোগ আর তার মূল্য দিতে হল তিনটি প্রাণকে। এখন তদন্তে নজর, এই ঘটনায় দায় কতদূর গড়ায়।











