নিজস্ব সংবাদদাতা, নারায়ণগড়: একদিকে অসুস্থ বৃদ্ধা মা, অন্যদিকে বাড়ির সামনে এমন রাস্তা যে সেখানে অ্যাম্বুল্যান্স পৌঁছনোর উপায় নেই! শেষ পর্যন্ত মাকে বাঁচাতে বাঁশ আর দড়ি দিয়ে তৈরি হল ঝুলন্ত খাটিয়া। তাতেই বৃদ্ধাকে শুইয়ে কাঁচা-বেহাল রাস্তা ধরে কাঁধে করে নিয়ে গেলেন ছেলে ও পরিবারের সদস্যরা। প্রায় ২০০ মিটার পথ এভাবেই পার হওয়ার পর গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল তাঁকে।
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার নারায়ণগড় ব্লকের ৪ নম্বর কুনারপুর অঞ্চলের সুগড়িয়া গ্রামের এই দৃশ্য এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। আর ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই প্রশ্ন উঠছে স্বাধীনতার এত বছর পরেও অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে যদি বাঁশের খাটিয়াই ভরসা হয়, তাহলে গ্রামের রাস্তা ও জরুরি পরিষেবার হাল কোথায় দাঁড়িয়ে?
অসুস্থ বৃদ্ধা আরতি সাহুর (৭৪) ছেলে শুভেন্দু সাহু জানান, তাঁর মা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। সোমবার আচমকা শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু তাঁদের বাড়ি ঢালাই রাস্তা থেকে প্রায় ২০০ মিটার ভিতরে। সেই পথ এতটাই বেহাল যে অ্যাম্বুল্যান্স বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছনোর উপায় ছিল না বলে পরিবারের দাবি। সময় নষ্ট করার মতো পরিস্থিতিও ছিল না। তাই পরিবারের সদস্যরা বাঁশ ও দড়ি দিয়ে তড়িঘড়ি একটি ঝুলন্ত খাটিয়া তৈরি করেন। তাতে বৃদ্ধাকে শুইয়ে কাঁধে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ঢালাই রাস্তা পর্যন্ত। সেখান থেকে গাড়ির ব্যবস্থা করে তাঁকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া হয়।
ঘটনাকে ঘিরে ক্ষোভ ছড়িয়েছে স্থানীয়দের একাংশের মধ্যে। তাঁদের অভিযোগ, গ্রামের দু’দিকে প্রায় ২০০ মিটার করে রাস্তা দীর্ঘদিন ধরেই বেহাল। প্রায় ১০০টি পরিবারকে প্রতিদিন সেই দুর্ভোগের মধ্যেই যাতায়াত করতে হয়। অ্যাম্বুল্যান্স বা চারচাকা গাড়ি ঢোকা তো দূরের কথা, বাইক চালাতেও সমস্যা হয়। স্কুলপড়ুয়াদেরও বিপজ্জনক রাস্তা পেরিয়ে যাতায়াত করতে হয় বলে দাবি বাসিন্দাদের। গ্রামবাসীদের একাংশের অভিযোগ, বহুবার সমস্যার কথা তুলে ধরা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। তাঁদের দাবি, তৃণমূল সরকারের আমলেও রাস্তার পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।
ঘটনা প্রসঙ্গে নারায়ণগড় ব্লকের সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক তাপস বিশ্বাস জানিয়েছেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে। রাস্তার সমস্যা থাকলে প্রয়োজনীয় মেরামতের ব্যবস্থা করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে বিধায়ক রমাপ্রসাদ গিরির দাবি, বাম ও তৃণমূল দুই আমলেই ওই এলাকায় প্রয়োজনীয় রাস্তার কাজ হয়নি। দ্রুত রাস্তা সংস্কারের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
একজন অসুস্থ মাকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে যখন পরিবারের হাতে শেষ ভরসা হয়ে ওঠে বাঁশ আর দড়ির খাটিয়া, তখন সেই দৃশ্য শুধু একটি পরিবারের অসহায়তার ছবি হয়ে থাকে না গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জরুরি স্বাস্থ্যপরিষেবা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।
এখন প্রশ্ন একটাই বাঁশের খাটিয়ায় রোগী নিয়ে যাওয়ার ছবি ভাইরাল হওয়ার পর কি বদলাবে সুগড়িয়ার রাস্তার হাল, নাকি প্রতিশ্রুতির পথেই আবার আটকে থাকবে রাস্তা সংস্কার?











