ইন্দ্রজিৎ সাহু, সবং: সময় বদলেছে, জমিদারি হারিয়েছে অতীতের জৌলুস, কিন্তু বদলায়নি পুজোর রীতি। পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ের মোহাড় কানুচকের মাইতি বাড়িতে প্রায় ৩০০ বছর ধরে একই নিষ্ঠায় হয়ে আসছে দুর্গাপুজো। পরিবারের দাবি, এই পুজোর সূচনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক স্বপ্নাদেশের কাহিনি।
মাইতি পরিবারের প্রবীণ সদস্য প্রভাত মাইতি জানান, তাঁদের কুলদেবতা দধিবামন জীউ। পারিবারিক ইতিহাস অনুযায়ী, প্রায় ৫০০ বছর আগে পূর্বপুরুষ জগমোহন দধিবামন জীউকে এনে পুজো শুরু করেন। সেই ধর্মীয় পরম্পরার ধারাবাহিকতায় পরে পরিবারে শুরু হয় দুর্গার আরাধনা। পরিবারের দাবি, ওড়িশার জাজপুর এলাকা থেকে সবংয়ের মোহাড় কানুচকে এসে বসতি গড়েছিলেন রামপ্রসাদ মহান্তি। জমিদারি দেখাশোনার পাশাপাশি লবণ সংক্রান্ত রাজস্ব সংগ্রহের কাজের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। পরে পরিবারের পদবি বদলে ‘মাইতি’ হয়।
পারিবারিক লোককথা অনুযায়ী, রামপ্রসাদ ছিলেন নিঃসন্তান। এক রাতে স্বপ্নে দেবী দুর্গার দর্শন পান তিনি। দেবী নাকি তাঁকে নিজের হাতে মাটির প্রতিমা তৈরি করে পুজো করার নির্দেশ দেন। সেই বিশ্বাস থেকেই শুরু হয় মাইতি বাড়ির দুর্গাপুজো।
প্রথম দিকে পরিবারের সদস্যের হাতেই তৈরি হত প্রতিমা। বর্তমানে স্থানীয় শিল্পী তৈরি করেন একচালার সাবেকি দুর্গামূর্তি। দেবীর দু’পাশে লক্ষ্মী ও সরস্বতী, নীচে কার্তিক ও গণেশ। প্রতিমার সাজ ও পুজোর আচারেও এখনও বজায় রয়েছে পুরনো দিনের ছাপ।
এই পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব হল, মহালয়ার দিন থেকেই শুরু হয় বিভিন্ন আচার। পঞ্চমী থেকে নবমী পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা নিরামিষ আহার করেন। একসময় পাঁঠাবলির প্রচলন থাকলেও এখন তা বন্ধ। তবে বলির কাজে ব্যবহৃত পুরনো খড়্গটি এখনও পরিবারের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরও বহু পুরনো সামগ্রীও যত্নে রেখে দিয়েছে পরিবার। রয়েছে পুরনো থালা-বাসন, ভোগ রান্নার হাঁড়ি এবং বিভিন্ন পুজোর উপকরণ। পরিবারের কাছে এগুলি শুধু ব্যবহার্য সামগ্রী নয়, বরং কয়েক প্রজন্মের স্মৃতির অংশ।
দুর্গাপুজোর প্রায় এক মাস আগে থেকেই বাড়িতে শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। পুরনো সামগ্রী পরিষ্কার করা, ভোগের আয়োজন এবং পুজোর অন্যান্য দায়িত্ব ভাগ করে নেন পরিবারের সদস্যরা। কর্মসূত্রে বাইরে থাকা মেয়েরাও পুজোর সময় বাপের বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেন।
মাইতি বাড়ির ভোগের তালিকাতেও রয়েছে ঐতিহ্যের ছোঁয়া। দেবীর কাছে নিবেদন করা হয় কাঁঠালি কলা, নারকেল দিয়ে তৈরি মিষ্টি এবং গাওয়া ঘিয়ে ভাজা লুচি। বহু বছর ধরে একই রীতি অনুসরণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। দশমীতে বাড়ির নিজস্ব পুকুরেই প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। ওই দিন পরিবারের প্রায় সব সদস্য একত্রিত হন। কয়েক দিনের পুজোকে কেন্দ্র করে বাড়ি ভরে ওঠে আড্ডা, গান এবং পারিবারিক মিলনমেলায়।
জমিদারি ব্যবস্থা বহু আগেই ইতিহাস হয়েছে। কিন্তু প্রায় তিন শতক আগে শুরু হওয়া এই দুর্গাপুজো এখনও মাইতি পরিবারের কাছে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং পারিবারিক পরিচয় ও উত্তরাধিকারের অংশ। প্রজন্ম বদলালেও সেই ঐতিহ্য এখনও একই ভাবে বয়ে চলেছে সবংয়ের মোহাড় কানুচকে।













