প্রথম পাতারাজনীতিপশ্চিমবঙ্গকলকাতাদেশআন্তর্জাতিকবিনোদনখেলালাইফস্টাইলআবহাওয়াভাইরালচাকরিবাজারদরবিজ্ঞান প্রযুক্তিস্বাস্থ্যঐতিহাসিক
---Advertisement---

তাঁদের কণ্ঠ থামলেই কি থেমে যাবে ‘চাঙ’? সবংয়ের তিন বৃদ্ধ শিল্পীই এখন শেষ ভরসা

Published on: July 31, 2026
---Advertisement---

ইন্দ্রজিৎ সাহু: সরকারি উদ্যোগের খবর তাঁদের কাছে পৌঁছায় না। লোকশিল্পীদের জন্য সরকারি ভাতা রয়েছে, সেটাও জানেন না। নেই শিল্পীর পরিচয়পত্র। অথচ তাঁদের কণ্ঠেই এখনও বেঁচে রয়েছে লোধা সম্প্রদায়ের কয়েকশো বছরের প্রাচীন লোকসংস্কৃতি ‘চাঙ’ গান। সবংয়ের দশগ্রাম খাজুরি বুথের ডমপাতা এলাকার তিন লোধা সহোদর পূর্ণচন্দ্র, শম্ভু ও গুরুপদ কোটাল। অক্ষরজ্ঞানহীন এই তিন প্রবীণ শিল্পীর জীবিকা দিনমজুরি ও ভিক্ষাবৃত্তি। অভাবের সংসারের মধ্যেও বাপ-ঠাকুরদার কাছ থেকে পাওয়া চাঙের ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে রেখেছেন তাঁরা।

লোধা সম্প্রদায়ের গীত ও বাদ্যের সমন্বয়ে পরিবেশিত এই চাঙ একসময় ছিল তাঁদের অন্যতম প্রধান বিনোদন। লোধা পাড়ার বার্ষিক পুজো, বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন পারিবারিক আচার—প্রায় সব ক্ষেত্রেই বসত চাঙের আসর। একসময় সবংয়ের প্রায় সমস্ত লোধা পাড়ায় শোনা যেত চাঙের গান ও বাদ্যের সুর। প্রয়োজনে দূরদূরান্ত থেকেও শিল্পীদের নিয়ে আসা হত। কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিক বিনোদনের চাপে ক্রমশ হারিয়ে গিয়েছে চাঙের আসর। অর্থের অভাবে বাদ্যযন্ত্র মেরামত বা নতুন করে তৈরি করতে না পারায় বহু শিল্পী চর্চা ছেড়ে দিয়েছেন। বর্তমানে ডমপাতার এই তিন প্রবীণ সহোদরের হাতেই কোনওরকমে টিকে রয়েছে সবংয়ের চাঙ সংস্কৃতি।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, পরবর্তী প্রজন্মের কেউ আর এই শিল্পের চর্চা করছেন না। ফলে অভাব, অবহেলা ও সরকারি স্বীকৃতির অভাবে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এগোচ্ছে কয়েকশো বছরের এই লোকশিল্প। চাঙ সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন সবংয়ের চাঁদকুড়ি এলাকার শিক্ষক ও চাঙ গবেষক শান্তনু অধিকারী। তাঁর কথায়, লোধাদের চাঙ সংস্কৃতি আজ কার্যত অবলুপ্তির পথে। যাঁরা এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন, তাঁরা সকলেই প্রবীণ। তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে চাঙ নিয়ে কোনও উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না।

শান্তনুবাবুর মতে, একসময় লোধা সম্প্রদায়ের পুজো-পার্বণে চাঙের গান ছিল অপরিহার্য। চাঙের গান ছাড়া মায়ের জাগরণও সম্পূর্ণ হত না। অথচ এখন সেই জায়গা দখল করেছে সাউন্ড বক্স। নতুন প্রজন্মের এই অনাগ্রহে ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে এখনও আশার আলো দেখছেন গবেষকরা। সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে নতুন প্রজন্মকে চাঙ সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এই প্রাচীন লোকশিল্পকে বাঁচানো সম্ভব বলে মনে করছেন তাঁরা। পাশাপাশি প্রবীণ শিল্পীদের সরকারি শিল্পী ভাতার আওতায় আনার দাবিও উঠেছে।

চাঙ শিল্পী শম্ভু কোটাল জানান, তিন-চারশো বছর ধরে তাঁদের পরিবারে এই গান চলে আসছে। তাঁর বাপ-ঠাকুরদারাও চাঙ নিয়ে পুজো-পার্বণে গান করতেন এবং বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে গান গেয়ে ভিক্ষা করে সংসার চালাতেন। সেই ঐতিহ্য মেনেই আজও তাঁরা চাঙ নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে গান করেন। তাঁর আবেদন, সরকার তাঁদের শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দিক এবং শিল্পী ভাতার ব্যবস্থা করুক। তাতে একদিকে যেমন তাঁদের সংসার চালাতে সুবিধা হবে, তেমনই এই প্রাচীন শিল্পটিও কিছুটা সুরক্ষা পাবে। তিন বৃদ্ধ সহোদরের কণ্ঠে আজও বেঁচে আছে চাঙের সুর। কিন্তু তাঁদের পর সেই সুর কে বহন করবে? প্রশাসনিক উদ্যোগ না এলে কয়েকশো বছরের এই লোকসংস্কৃতি যে অচিরেই ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যেতে পারে, সেই আশঙ্কাই এখন প্রবল।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now