নিজস্ব সংবাদদাতা, সবং: ছয় বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা। অসংখ্য নির্ঘুম রাত, উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা আর একদিন ঘরের ছেলে ফিরে আসবে এই বিশ্বাস আঁকড়ে বেঁচে ছিল পরিবার। অবশেষে সেই অপেক্ষারই অবসান ঘটল শনিবার। ২০২০ সাল থেকে নিখোঁজ থাকা পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সবং ব্লকের সাউতপাড়া এলাকার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ প্রামাণিক প্রায় ছয় বছর পর ফিরলেন নিজের বাড়িতে। দীর্ঘদিন পর ছেলেকে চোখের সামনে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা-মা। আবেগ ধরে রাখতে পারেননি স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্যরাও।
পুজোয় বাইরে খাওয়ার প্ল্যান? তেমাথানির ‘Spice Hut’-এ অপেক্ষায় বিরিয়ানি, মোমো, পিজ্জা ও আরও অনেক কিছু
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২০ সালে পারিবারিক অশান্তির পর স্ত্রী এবং মাত্র দু’মাসের সন্তানকে বাড়িতে রেখেই আচমকা বেরিয়ে যান বিশ্বজিৎ। তারপর আর বাড়ি ফেরেননি। সেই সময় পরিবারের পক্ষ থেকে সবং থানায় লিখিতভাবে নিখোঁজ অভিযোগ দায়ের করা হয়। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে শুরু করে বহু জায়গায় খোঁজ চালিয়েও তাঁর কোনও সন্ধান মেলেনি। দিন মাস পেরিয়ে বছর হয়েছে। তবু আশা ছাড়েননি বাবা-মা, স্ত্রী ও বোন। বিশ্বজিৎ একদিন ফিরবেন এই বিশ্বাসে বিভিন্ন মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনাও করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
পরিবারের দাবি, বাড়ি ছাড়ার পর একটি মালগাড়িতে চেপে ভিনরাজ্যে চলে যান বিশ্বজিৎ। পরে উত্তরপ্রদেশের শামলী জেলার শরণপুর এলাকার এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর ধরে আখের জমি ও মহিষ দেখাশোনার কাজ করতেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, সেখানে তাঁর সঙ্গে ভাল আচরণ করা হত না, পর্যাপ্ত খাবার না দেওয়ার পাশাপাশি নির্যাতনও করা হত।
সম্প্রতি সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পান বিশ্বজিৎ। পরিবারের বক্তব্য, ওই ব্যক্তিকে ডাক্তার দেখানোর কথা বলে কোনওরকমে সেখান থেকে বেরিয়ে পালিয়ে আসেন তিনি। এরপর রাস্তায় হাঁটার সময় তাঁর সঙ্গে দেখা হয় দিল্লির বাসিন্দা তনুজ চৌহান নামে এক সহৃদয় ব্যক্তির।
বিশ্বজিতের অবস্থা দেখে তাঁর পরিচয় জানার চেষ্টা করেন তনুজ। কথাবার্তার মাধ্যমে তাঁর বাড়ির ঠিকানা ও পরিবারের সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি। এরপর গত ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্বজিতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তনুজ চৌহান। তিনি জানান, বিশ্বজিৎ তাঁর কাছেই নিরাপদে রয়েছেন এবং পরিবারের সদস্যদের তাঁকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তনুজ বিষয়টি স্থানীয় কাঞ্জাওয়ালা থানাতেও জানান। এরপর সবং থানার পুলিশের সহযোগিতায় পরিবারের সদস্যরা ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেন। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে শনিবার বিশ্বজিৎকে সঙ্গে নিয়ে সাউতপাড়ার বাড়িতে ফিরে আসেন তাঁরা।
ছয় বছর পর ছেলেকে ফিরে পেয়ে আবেগ সামলাতে পারেননি বিশ্বজিতের বাবা অনন্ত প্রামাণিক। তাঁর কথায়, “তনুজ চৌহান নামে ওই ভদ্রলোক না থাকলে হয়তো ছেলেকে আর ফিরে পেতাম না। দু’দিন আগে ভোরবেলা ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম। সেই স্বপ্ন যে এভাবে সত্যি হবে, ভাবতে পারিনি।” একই সঙ্গে ছেলেকে ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য সবং থানার পুলিশকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।
বিশ্বজিৎ বাড়ি ফেরার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ। খবর পেয়ে তাঁর বাড়িতে মিষ্টি ও ফুলের তোড়া নিয়ে পৌঁছে যান সবংয়ের বিধায়ক অমল পণ্ডা। তিনি বিশ্বজিৎকে ফুলের মালা পরিয়ে ও মিষ্টি খাইয়ে স্বাগত জানান। পাশাপাশি বিশ্বজিৎকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার জন্য তনুজ চৌহান এবং সবং থানার পুলিশকে ধন্যবাদ জানান বিধায়ক। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিনের এই ঘটনার পর বর্তমানে বিশ্বজিতের মানসিক অবস্থারও যত্ন প্রয়োজন। তাঁকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার দিকেই এখন সবচেয়ে বেশি নজর দিচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা।
যে সন্তান মাত্র দু’মাস বয়সে বাবার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছিল, ছয় বছর পর সেই বাবাকেই আবার পেল নিজের বাড়ির উঠোনে। এতদিনের অপেক্ষা, দুশ্চিন্তা আর চোখের জল পেরিয়ে প্রামাণিক পরিবারে এখন ফিরে পাওয়ার আনন্দ। আর এই পুনর্মিলনের নেপথ্যে দিল্লির তনুজ চৌহানের মানবিক উদ্যোগ নতুন করে মনে করিয়ে দিল অচেনা মানুষের সামান্য সহমর্মিতাও কখনও কখনও একটি পরিবারকে ফিরিয়ে দিতে পারে তার হারিয়ে যাওয়া আপনজন।











