নিজস্ব সংবাদদাতা, খড়্গপুর: সাতসকালে চায়ের কাপে রাজনীতির ঝড়! বৃহস্পতিবার সকালে খড়্গপুর শহরে চা-চক্রে যোগ দিয়ে রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে মুখ খুললেন দিলীপ ঘোষ। মিঠুন চক্রবর্তীর নতুন দায়িত্ব থেকে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে নিশানা, খড়্গপুরের ছাত্রের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা থেকে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা একের পর এক প্রশ্নের জবাব দিলেন তিনি। পাশাপাশি আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের বঙ্গ সফর এবং পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন দিলীপ।
রাজ্য সরকারের উপদেষ্টা হিসাবে মিঠুন চক্রবর্তীকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রসঙ্গ উঠতেই অভিনেতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ দিলীপ ঘোষ। তাঁর কথায়, ‘‘মিঠুন চক্রবর্তী একজন আইকন। আমরা চাই পশ্চিমবাংলার উন্নয়নে তাঁর যোগদান থাকুক। জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি সংস্কৃতি জগতে কাটিয়েছেন। সেখানে তাঁকে যোগ্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’’
দিলীপের দাবি, পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও মিঠুনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। আগামী দিনে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রাজ্যের কাজে আসবে বলেই আশাবাদী তিনি। রাজ্যের তিন অফিসারকে নিয়ে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে কার্যত আক্রমণাত্মক মেজাজে দেখা যায় দিলীপকে। নাম না করে নয়, সরাসরি একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম তুলে সমালোচনা করেন তিনি।
দিলীপের কটাক্ষ, কিছু মানুষ নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে হতাশ হয়ে পড়েছেন। কী করবেন, তা বুঝে উঠতে পারছেন না। রাহুল গান্ধী থেকে মহুয়া মৈত্র, কুণাল ঘোষ এবং হুমায়ুন কবিরের নাম উল্লেখ করে তাঁদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, জনপ্রতিনিধিদের কথাবার্তা ও ব্যবহারে সংযম থাকা উচিত। বারবার বিতর্কে জড়িয়ে পড়া কিংবা সীমা অতিক্রম করা গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ নয়। এতে সমাজের কাছেও ভুল বার্তা পৌঁছয়।
সম্প্রতি খড়্গপুর শহরে এক ছাত্রের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাতেও প্রতিক্রিয়া জানান দিলীপ ঘোষ। শহরের অতীতের অপরাধপ্রবণ পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একসময় খড়্গপুরে অপরাধী, মাফিয়া এবং দুষ্কৃতীদের দাপট ছিল। বর্তমানে সেই পরিস্থিতির অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। তবে এখনও বিভিন্ন এলাকায় বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে বলে দাবি তাঁর।
দিলীপের বক্তব্য, পুলিশ সেই সমস্ত অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা করছে। ছাত্রের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা নিজেদের মধ্যে কোনও বিবাদের জেরে ঘটে থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। যদিও ঘটনার তদন্ত এখনও চলছে।
মুর্শিদাবাদের জলঙ্গির একটি খারিজি মাদ্রাসায় নাবালককে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্নের মুখোমুখি হন দিলীপ ঘোষ। ঘটনাকে নিন্দনীয় বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, অভিযোগের তদন্ত করে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তাঁর দাবি, মাদ্রাসা সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে সরকার কঠোর পদক্ষেপ করছে। আগামী দিনে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেও আশাপ্রকাশ করেন তিনি।
বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের বাড়িতে দুষ্কৃতী হামলার অভিযোগ প্রসঙ্গেও পুলিশের ভূমিকার উপর গুরুত্ব দেন দিলীপ। তাঁর বক্তব্য, কারও সঙ্গে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত মতবিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই কারণে কারও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া উচিত নয়। বিকাশরঞ্জন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং জনপ্রতিনিধি। তাঁর নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঘটনার বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে পুলিশের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন দিলীপ।
মোহন ভাগবতের বঙ্গ সফর, সংঘের সংগঠন নিয়ে আশাবাদী। আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের পশ্চিমবঙ্গ সফর প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ বলেন, সংঘের সাংগঠনিক কাজ সারা বছরই চলে। তাঁর দাবি, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ব আন্দোলনে নতুন গতি এসেছে। আগের তুলনায় বাধাবিপত্তিও অনেকটাই কমেছে। গ্রামেগঞ্জে নতুন শাখা তৈরি হচ্ছে এবং উৎসাহের সঙ্গে সংঘের সাংগঠনিক কাজ এগিয়ে চলেছে বলে দাবি করেন তিনি।
‘ইংরেজিতে পশ্চিমবঙ্গ লিখতে অসুবিধা কোথায়?’
রাজ্যের ইংরেজি নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গেও স্পষ্ট মত দিলীপের। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের নাম ইংরেজিতেও পশ্চিমবঙ্গ লেখা উচিত। মধ্যপ্রদেশ কিংবা উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যের নাম যদি ইংরেজিতেও একইভাবে লেখা যায়, তা হলে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম কেন?
দিলীপের যুক্তি, নামের কোনও অনুবাদ হয় না। পশ্চিম মেদিনীপুরের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ইংরেজিতে জেলার নাম ‘ওয়েস্ট মেদিনীপুর’ লেখা হয় না। এতদিন যে পদ্ধতি চলে এসেছে, তা সংশোধন করা প্রয়োজন বলে মত তাঁর। সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে খড়্গপুরের চা-চক্রে রাজ্য রাজনীতির নানা বিতর্কিত প্রসঙ্গ উঠে এল দিলীপ ঘোষের বক্তব্যে। কোথাও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তীব্র কটাক্ষ, কোথাও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য, আবার কোথাও মিঠুন চক্রবর্তীর প্রশংসা। চায়ের আড্ডায় এ দিন কার্যত রাজ্যের একাধিক ইস্যুতে নিজের অবস্থান তুলে ধরলেন দিলীপ।














