Sabang bulletin: তিনি নেই। অথচ রেডিয়োয় হঠাৎ কোনও পুরনো গান বেজে উঠলেই মনে হয়, সেই চেনা কণ্ঠ যেন এখনও খুব কাছেই। প্রেমের আবেশ হোক কিংবা বিচ্ছেদের বিষণ্ণতা কয়েক দশক ধরে বাঙালির সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে রয়েছে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান। ৪ অক্টোবর কিংবদন্তি শিল্পীর ৯৫তম জন্মবার্ষিকী। জন্মদিনে ফের স্মৃতির পাতায় ‘গীতশ্রী’।
১৯৩১ সালের ৪ অক্টোবর কলকাতার ঢাকুরিয়ায় জন্ম সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। চিন্ময় লাহিড়ী, এ টি কানন-সহ একাধিক গুণী সংগীতশিল্পীর কাছে তালিম নেওয়ার পরে পাতিয়ালা ঘরানার কিংবদন্তি ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খাঁর কাছেও সংগীত শিক্ষা নিয়েছিলেন তিনি। সেই শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিতের উপর দাঁড়িয়েই পরবর্তী সময়ে তৈরি হয়েছিল তাঁর নিজস্ব গায়কি।
বাংলা গানের পাশাপাশি মুম্বইয়েও শুরু হয়েছিল তাঁর নেপথ্য সংগীতের সফর। ১৯৫১ সালে ‘তরানা’ ছবিতে লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে দ্বৈত গান গেয়েছিলেন সন্ধ্যা। হিন্দি ছবিতে কাজের সুযোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত বাংলা গানই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান কর্মক্ষেত্র।
তার পরের ইতিহাস বাঙালির অজানা নয়। বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেনের পর্দার রোম্যান্সের সঙ্গে যেমন জড়িয়ে গিয়েছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ, তেমনই সুচিত্রার হয়ে বহু স্মরণীয় গানে প্রাণ ঢেলেছিলেন সন্ধ্যা। হেমন্ত-সন্ধ্যা জুটি বাংলা গানের ইতিহাসে তৈরি করেছিল আলাদা আবেগের জায়গা।
‘এই পথ যদি না শেষ হয়’, ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’, ‘আমি স্বপ্নে তোমায় দেখেছি’ এমন বহু গান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শ্রোতাদের কাছে সমান জনপ্রিয়। বদলেছে রেকর্ড থেকে ক্যাসেট, ক্যাসেট থেকে ডিজিটাল মাধ্যম। কিন্তু তাঁর কণ্ঠের আবেদন যেন সময়ের সঙ্গে পুরনো হয়নি।
শুধু প্রেমের গান নয়, ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে তাঁর নাম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীদের সাহায্যে অর্থ সংগ্রহ থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়া গানকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করেছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তাঁর কণ্ঠে ধরা পড়েছিল আশা ও আবেগের বার্তা।
‘জয় জয়ন্তী’ ও ‘নিশিপদ্ম’ ছবির গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে। জীবনের শেষ পর্বে কেন্দ্রের প্রস্তাবিত পদ্মশ্রী সম্মান গ্রহণ না করার সিদ্ধান্তও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছিল।
২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, ৯০ বছর বয়সে থেমে যায় তাঁর জীবনের সফর। কিন্তু একজন শিল্পীর কি সত্যিই মৃত্যু হয়, যদি তাঁর কণ্ঠ প্রতিদিন ফিরে আসে মানুষের স্মৃতিতে? সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে উত্তরটা হয়তো লুকিয়ে রয়েছে তাঁর গানেই। শিল্পী নেই, অথচ সন্ধ্যা নামলেই কোথাও না কোথাও এখনও বাজে তাঁর সুর। বাংলা গানের আকাশে তাই ‘গীতশ্রী’ আজও এক অমলিন নাম।














